সোমবার, ০১-জুন ২০২০, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন
  • অন্যান্য
  • »
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক সুলতান কাবুস

আরব বিশ্বের অনন্য শাসক সুলতান কাবুস

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সমৃদ্ধ ওমানের জনক বলা হয় সুলতান কাবুসকে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি ছিলেন দেশটির শাসক। এ সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক নানা গোলযোগের মধ্যেও নিজের দেশকে একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমৃদ্ধ এক রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। গত ১১ জানুয়ারি ওমান সরকার তার মৃত্যুর খবরটি ঘোষণা করে। আমাদের আজকের আলোচনা আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যতিক্রমী এ শাসককে নিয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের শাসক
মৃত্যুর সময় সুলতান কাবুসের বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা থেকে কাবুসের মৃত্যুর খবরটি ঘোষণা করা হলেও ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রদান করা হয়নি। তবে ২০১৪ সাল থেকেই তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শরীরে বাসা বাঁধা ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
পাঁচ দশকের শাসনামলে তেল সম্পদের যথার্থ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নিজের দেশ থেকে সম্পূর্ণরূপে দারিদ্র্যকে দূর করেছেন কাবুস। সমৃদ্ধ ওমানের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশটির অবিসাংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। ওমানে অসংখ্য রাস্তা, একটি বন্দর, একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি খেলার মাঠ এবং অন্যান্য আরও অনেক কিছুই সুলতান কাবুসের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে নিজের দেশকে শাসন করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের মতো গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থান হলেও ওমানকে তিনি পণ্য পরিবহনে পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত রুটে পরিণত করেছেন। শুধু তাই নয়, বিচক্ষণতা এবং নিরপেক্ষ অবস্থানের মধ্য দিয়ে নিজেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলেন।
একে অন্যের শত্রুরাও বন্ধু ওমানের
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যে হানাহানি, রাজনৈতিক বিভেদ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ চলছে তার মধ্যে থেকেও সুকৌশলী নেতৃত্বের জন্য তাকে চ্যাম্পিয়ন না বলে কোনো উপায় নেই। বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক স্থাপন করেছেন। এমনকি এসব দেশের মধ্যে একটির সঙ্গে অন্যটির শত্রুতার সম্পর্ক থাকলেও সবার সঙ্গেই তার সম্পর্ক অটুট ছিল। উদাহরণস্বরূপ ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চরম শত্রুতার সম্পর্ক থাকলেও দুই দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্ব ছিল ওমান সুলতানের। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল তার। মিত্রতা ছিল আমেরিকার সঙ্গেও।
নিজের দেশ ওমানকে তিনি পরিণত করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ডে যেখানে শত্রুভাবাপন্ন বিভিন্ন পক্ষ পরস্পরের সঙ্গে নানা ইস্যুতে আলোচনা এবং সমঝোতা বৈঠকে মিলিত হয়। ২০১১ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরানে তিন মার্কিন পর্বত আরোহীর জেল হলে তাদের মুক্ত করতে মধ্যস্থতা করেছিল ওমান। সেবার প্রতিজনের জন্য মুক্তিপণ হিসেবে ৫ লাখ ডলার করে মোট ১৫ লাখ ডলারও পরিশোধ করে দেয় ওমান।
কয়েক বছর আগে শত্রুভাবাপন্ন ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওবামা প্রশাসনকে আলোচনার জন্য এক টেবিলে এনেছিলেন সুলতান কাবুস। ওই আলোচনার সূত্র ধরেই তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে দু’পক্ষ।
কাবুসের উত্তরাধিকার
জীবনের বেশিরভাগ সময়ই অবিবাহিত অবস্থায় কাটিয়ে দেন কাবুস। তার কোনো সন্তানও নেই। ওমানের শাসক হিসেবে তিনি প্রকাশ্যে কোনো উত্তরাধিকারীকেও মনোনীত করেননি। দেশটির প্রচলিত আইন অনুসারে, সুলতানের মৃত্যুর পর রাজপরিবারের সদস্যদের একটি পরিষদ আলোচনার ভিত্তিতে একজনকে নতুন সুলতান মনোনীত করবে। আর এ পরিষদ যদি কোনো সুযোগ্য উত্তরাধিকারীকে মনোনীত করতে ব্যর্থ হয়, আরও একটি উপায় আছে। এ ক্ষেত্রে ওই পরিষদ একটি গোপন চিঠির খাম উন্মোচন করবে। মৃত্যুর আগে সুলতান কাবুস নিজের হাতেই এ চিঠি লিখে গেছেন, যেখানে তিনি তার উত্তরাধিকারী হিসেবে একজনের নাম প্রস্তাব করে গেছেন।
উত্তরাধিকারী নির্বাচনের এ ব্যতিক্রম প্রক্রিয়ায় সুলতানের চিঠির ওপরই ভরসা রেখেছে ওমানের রাজপরিষদ। সুলতান কাবুসের মৃত্যুর পরপরই তার চিঠির খাম উন্মোচন করা হয়। এ চিঠিতে সুলতান তার উত্তরাধিকারী হিসেবে যার নাম প্রস্তাব করে গেছেন তিনি হলেন ৬৫ বছর বয়সী হাইথাম বিন তারিক আল সাইদ। তিনি সুলতান কাবুসের চাচাতো ভাই। সম্প্রতি তিনি ওমানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কাবুসের ইচ্ছা অনুযায়ী, হাইথাম বিন তারিক আল সাইদই এখন ওমানের নতুন সুলতান। উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হওয়ার পরপরই টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি কাবুসের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বদলে দেন ওমানকে
কাবুস ওমানের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন ১৯৭০ সালে। সে সময় তিনি মাত্র ২৯ বছরের যুবক। যে সময়টিতে তিনি ক্ষমতায় আসেন সেই সময়টিতে ওমান ছিল একটি দুর্বল, গরিব এবং একটি বিচ্ছিন্ন জাতি। গেরিলারা মাথাচাড়া দেওয়ায় দেশটির দক্ষিণ অংশে গৃহযুদ্ধ চলছিল তখন। একই সময়ে দেশটির মাটিতে সন্ধান পাওয়া নতুন তেল সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করে গেরিলাদের পরাস্ত করতে সক্ষম হন তিনি।
এছাড়াও নানা উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা করেন কাবুস। এসব প্রকল্পের মধ্যে ছিল দেশজুড়ে নতুন নতুন রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুল এবং অন্যান্য অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এসব উন্নয়নের মধ্য দিয়েই ভাগ্য বদলে যেতে শুরু করে ওমানের মানুষের। এ উন্নয়ন ওমানকে এক সময় এমন এক অবস্থানে নিয়ে যায় যে, ২০১০ সালে জাতিসংঘ দেশটিকে মানব উন্নয়ন সূচকে চীনের চেয়েও এগিয়ে রাখে। এ সময়ের মধ্যে ৪৬ লাখ মানুষের দেশ ওমানে এক মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন কাবুস। নিজের দেশ ছাড়িয়ে আরব বিশ্বেও তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বলা যায়, শাসনকাজে তিনি এক হাতেই সামলেছেন ওমানকে। সুলতান থাকা অবস্থায় তিনি একাধারে ওমানের প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীরও দায়িত্ব পালন করেছেন। ওমানের সমৃদ্ধিতে তার নেতৃত্ব এতটাই প্রভাব রেখেছে যে, দেশটিতে নবজাগরণ দিবস হিসেবে পালন করা হয় ২৩ জুলাইকে। কারণ এ তারিখেই তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। তার জন্মদিন ১৮ নভেম্বর জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে ওমানে।
বিগত সময়গুলোতে কয়েক বছর তেলের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে ওমানে অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দিলেও এবং দেশটির মানুষের রাজনৈতিক অধিকার সীমাবদ্ধ থাকলেও তার সুকৌশলী পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই বিদেশিদের বাহবা কুড়িয়েছে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের ভেতর নির্মাণ এবং উন্নয়নের কাজ করি। আর বিদেশিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, শান্তি, ন্যায়বিচার ও সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং গঠনমূলক সংলাপে বিশ্বাস করি।’ তিনি বলেন, ‘এভাবেই আমরা শুরু করেছিলাম। আমরা এখনো এভাবেই আছি। আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা এভাবেই চলব।’
নিজের বাবাকেই উৎখাত করেছিলেন
১৯৪০ সালের ১৮ অক্টোবর ওমানের আল সাইদ রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কাবুস। ১৭৪৪ সাল থেকে এই পরিবার আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় অবস্থিত ওমানে রাজত্ব করে আসছে। কাবুস যখন শিশু তখন ওমান ছিল নিতান্তই গরিব এক দেশ। দেশটিতে মাত্র গুটি কয়েক রাস্তা তখন পাকা ছিল। সে সময় কাবুসের বাবা সাইদ বিন তইমুর ছিলেন ওমানের শাসক। তার কঠোর শাসনের জন্য বাইরের দেশগুলো ওমানকে অনেকটা একঘরে করে রাখে। সাইদ বিন তইমুরের       শাসনামলে ওমানের মানুষ সিমেন্ট এমনকি চশমাও সুলতানের অনুমতি ছাড়া কিনতে পারত না।
শৈশবেই পড়াশোনার জন্য কাবুসকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি সাফোকে অবস্থিত ‘বুরি সেইন্ট এডমুন্ডস’ এবং স্যান্ডহার্স্টে অবস্থিত রয়েল মিলিটারি একাডেমিতে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৫ সালে তার শাসক পিতা তাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বাড়িতে আসার পরই তাকে গৃহবন্দি করা হয়। এভাবে তিনি টানা ছয় বছর গৃহবন্দি ছিলেন। ওই সময়ে নতুন আবিষ্কৃত বিপুল তেল সম্পদের সূত্র ধরে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ওমান।
ছয় বছর গৃহবন্দি থাকার পর ১৯৭০ সালে ব্রিটিশদের সহযোগিতায় এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের সূত্রপাত করেন কাবুস। নিজের বাবাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ওমানের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তবে শুরুতেই তিনি গৃহযুদ্ধ থামানো এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। এ ক্ষেত্রে দেশের দক্ষিণ অংশে সক্রিয় বামপন্থি গেরিলাদের মোকাবিলা করার জন্য তিনি ইরানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা নেন এবং প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেন। আর দেশের উন্নয়নে তিনি তেল সম্পদের উত্তোলন শুরু করেন।
যেভাবে সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক
সুলতান কাবুসের সময়ই একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে ওমান। পরে তার হাত ধরেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ছাড়াও আরব লিগ এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে ওমান। এছাড়াও উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোকে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল’।
বলা যায়, বিশ্বের প্রায় সব আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ওমানের সুদৃঢ় সম্পর্কের নেতৃত্ব দেন কাবুস। ১৯৭৯ সালে ইসরাইলের সঙ্গে আরবের প্রথম দেশ হিসেবে মিসরের শান্তি চুক্তির নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। একই বছরে ইরানে ইসলামি বিপ্লব অনুষ্ঠিত হলে দেশটির নতুন শাসক শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন। পরে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে মজবুত বন্ধন নিশ্চিত করেন। কাবুস চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং ১৯৯৪ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ওমানেই প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজ্যাক রবিন সফর করেন। এর দুই বছর পর ইসরাইলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী শিমন প্যারেজও ওমান সফর করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওমানের। ২০১৩ সালে ওমান উপকূলে অবস্থিত নিজের বাসস্থানে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানান। এ আলোচনাই ২০১৫ সালে ইরান, আমেরিকা ও অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতার পথ তৈরি করে দেয়। যদিও পরে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সমঝোতা বাতিল করে ইরানের সঙ্গে এক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উপনীত হয়েছেন।
সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের মতো প্রতিবেশী অন্য দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্রও ওমানকে সবসময় কাছে টেনেছে এবং নিজেদের মিত্র বলে দাবি করেছে। তবে ২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হলে দ্বীপদেশ বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া মুসলমানরা সুন্নি শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে তাদের দমন করার জন্য সৌদি আরব ট্যাংক বহর পাঠায়। এই অভিযানে অংশ নিতে অপারগতা জানায় ওমান। এছাড়া ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হামলা শুরু হলে ওমান এতে অংশ না নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে। পরে সেখানকার যুদ্ধরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজন করে দেশটি। এছাড়া ২০১৬ সালে সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলো কাতারকে অবরুদ্ধ করার সময়ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে ওমান।
আরবের অন্যান্য শাসকের তুলনায় সত্যিকার অর্থেই সবসময় বিকল্প রাস্তা দিয়ে হেটেছেন কাবুস। ২০১৭ সালে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে আদালত চত্বরের বাইরে বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের কাছে শোক প্রকাশ করে চিঠি পাঠান সুলতান কাবুস। অথচ ওই সময়টিতে বাশার আল-আসাদকে একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল ওমানের মিত্র পশ্চিমা এবং আরবের বেশ কয়েকটি দেশ।
২০১৮ সালে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও নিজের প্রাসাদে স্বাগত জানান সুলতান। ওমানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখা যায়, সাদা পোশাক পরিহিত কাবুস দেশটির ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি এবং সাদা স্যান্ডেল পরে নেতানিয়াহু এবং তার স্ত্রী সারাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। যদিও ওই প্রতিবেদনে দুই নেতার মধ্যে কী কথোপকথন হয়েছে তা গোপন রাখা হয়।
জনপ্রিয়তা ও কঠোরতা
সুনিপুণ নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আমূল বদলে দেওয়ার জন্য নিজের দেশের মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন সুলতান কাবুস। কাগজে কলমে তিনি নাগরিকদের সরকারে অংশ নেওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে ওমানে প্রথমবারের মতো সংবিধান প্রণয়ন করেন তিনি, যেখানে দেশটির ২১ বছরের ঊর্ধ্বে সব নাগরিকের ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছে। যদিও ক্ষমতার কেন্দ্রে সবসময় তিনিই অবস্থান করেছেন এবং দেশটির সব রাজনৈতিক দল ও অননুমোদিত জনসমাবেশকে নিষিদ্ধ করেছেন।
২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় ওমানেও কিছু অসন্তোষ তৈরি হয়। কিন্তু দেশটিতে বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভ হয়নি। সে সময় ওমানের বিভিন্ন জায়গায় হাজার-হাজার মানুষ ভালো মজুরির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবির মধ্যে আরও ছিল অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্নীতি বন্ধ করা।
নিরাপত্তা বাহিনী প্রথম দিকে কিছুটা নমনীয় ভাব দেখালেও পরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল, রাবার বুলেট এবং তাজা গুলি ছুড়েছে। এতে দুই বিক্ষোভকারী নিহত হয় এবং ‘বে আইনি সমাবেশ’ ও সুলতানকে অপমান করার অভিযোগে শত শত মানুষকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তবে ওই ঘটনার পর সুলতান কাবুস দুর্নীতিবাজ এবং দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রিত্বে থাকা কিছু ব্যক্তিকে সরিয়ে দেন এবং সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেন।
আরবের অন্যান্য শাসকের মতো একাধিক বিয়ে করেননি কাবুস। ১৯৭৬ সালে তিনি তার চাচাতো বোন নাওয়াল বিনতে তারিক আল সাইদকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের দাম্পত্য জীবন মাত্র তিন বছর টিকেছিল এবং তারা ছিলেন নিঃসন্তান। জীবদ্দশায় কোনো ওমানী তার উত্তরাধিকার নিয়ে কখনো কোনো প্রকাশ্য আলোচনায় অংশ নেয়নি।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)