শুক্রবার, ১৪-আগস্ট ২০২০, ০৮:৫৬ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের জিএম পদোন্নতি নীতিমালায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় আবার পরিবর্তন
অযোগ্যদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি ও ঘুষ লেনদেনের শংকা

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের জিএম পদোন্নতি নীতিমালায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় আবার পরিবর্তন

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৬:০৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি ও পদায়নে ঘুষ লেনদেন বন্ধের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেটি অবশেষে ভেস্তে গেলো। ইতিপূর্বে তদবির, চাপ ও ঘুষ লেনদেনের ব্যাপক অভিযোগ উঠে এবং ব্যাংকগুলোতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগ্য জনবলেরও সংকট দেখা দেয়। আর এ কারণেই জিএম পদে পদোন্নতির নতুন নীতিমালা জারি করা হয়। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী জিএম পদোন্নতি-পদায়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন ‘পুল’ ব্যবস্থা গঠন করা হয়েছিল। এতে এক ব্যাংকে যোগ্য কর্মকর্তার সংকট দেখা দিলে অন্য ব্যাংক থেকে পদোন্নতি ও পদায়নের মাধ্যমে তা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। অযোগ্যদের পদোন্নতি-পদায়নের পথও বন্ধ হচ্ছিলো। কিন্তু নীতিমালাটি জারি করা হয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে। এরই মধ্যে দুর্নীতিবাজ চক্রের প্রভাবে নতুন এই নীতিমালাটি বাতিল করা হলো। ‘পুল’ ব্যবস্থার পরিবর্তে আবারো পুরনো সেই বিতর্কিত নীতিমালায় ফিরে গেলো সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এতে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টর সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন এবং এ সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষও মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ এমন বিতর্কিত পদক্ষেপে অসন্তোষ ও হতাশা ব্যক্ত করছেন। 
সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে সাধারণত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হয়ে থাকে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পর্যায় থেকে। এ কারণে মহাব্যবস্থাপক পদটিকে ‘নীতিনির্ধারণী পদ’ হিসেবেই ধরা হয়। ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘকাল ধরে এই পদগুলোতে পদোন্নতি ও পদায়নে ‘পুল’ ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। সেই সময় জিএম পদোন্নতিতে অনেক কিছুই বিচার-বিশ্লেষণ করা হতো। পদোন্নতির সাধারণ ক্রাইটেরিয়া ছাড়াও সত্যতা, দক্ষতা, কর্মস্পৃহাসহ অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় আনা হতো। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে গঠিত পুলের উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে প্রতিটি কর্মকর্তার বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই হতো। প্রত্যেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের একত্রে হিসাবে এনে সমন্বিতভাবে পদোন্নতি এবং পদায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। যে কারণে যোগ্য কর্মকর্তার সংকট পূরণ বা জিএম পদোন্নতি-পদায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতো না। তেমনি নতুন নিয়োগেও কোনো প্রশ্ন দেখা দিতো না। কারণ সেই সময় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মকর্তা নিয়োগ হতো ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি (বিআরসি)র অধীনে। কিন্তু ২০০৯ সালে সেই ‘বিআরসি’ এবং ‘পুল’ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়া হয়। আর এরফলে ব্যাংকিং খাতের জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে এক নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।   
২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী এই চারটি ব্যাংককে লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়। সেই পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ব সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমুহে নতুন নিয়োগ হতো বিআরসি (ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি) এর মাধ্যমে। মহাব্যবস্থাপক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদোন্নতি-পদায়ন হতো পুলের মাধ্যমে। কিন্তু লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার পর ২০০৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিআরসি এবং ‘পুল’ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। এরফলে জিএম (মহাব্যবস্থাপক) পর্যন্ত নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি সংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হাতে চলে যায়। সেই থেকে নতুন জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি-অনিয়ম ও ব্যাপক ঘুষ লেনদেনের প্রথা চালু হয়। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সবচেয়ে বড় চারটি ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল স্বচ্ছতা, জবাবদিহীতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু এরপর দেখা গেছে, এই ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভুয়া ঋণদান, অযৌক্তিক ও অবৈধভাবে সুদ মওকুফ, ঋণ অবলোপনসহ নানা কায়দায় দুর্নীতি-লুটপাট আগের চেয়েও অনেক বেড়েছে। আর্থিক অনিয়ম ছাড়াও এমনকি নিয়োগ-পদোন্নতিতেও ঘুষ বাণিজ্য ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর কর্মকা-ে অদক্ষতাও বেড়ে গেছে।
প্রতিটি নতুন নিয়োগে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এমনকি পদোন্নতিতেও বড় অংকের ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। জিএম পদোন্নতিতে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে। এসবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপ-তদবির প্রভৃতি চরম আকার ধারণ করে এবং এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেখা দেয়। ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে ২০১৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি (বিএসসি) গঠন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগের দায়িত্ব এই কমিটির হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি বা বিএসসি গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন জনবল নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা গেলেও জিএম পদে পদোন্নতি-পদায়নে ঘুষ লেনদেনের প্রথা থেকেই যায়। শুধু তাই নয়, ব্যাংকগুলোতে যোগ্য কর্মকর্তারও সংকট দেখা দেয়। অথচ জিএম পদ ব্যাংকিং সেক্টরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে পদোন্নতি-পদায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা অতি জরুরি। তাছাড়া কোনো ব্যাংকে জিএম পদে যোগ্য কর্মকর্তার সংকট থাকলে ওই ব্যাংকের পক্ষে সার্বিক কার্যক্রম সুচারুরূপে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এসব বিবেচনা করেই গত ১৭ জুলাই, ২০১৯ নতুন নীতিমালা জারি করা হয়। এই নীতিমালার অধীনে ‘পুল’ ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে এই পুল ব্যবস্থা গঠন করা হয়। ‘পুল’এর অধীনে পদোন্নতি ও পদায়নের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ইতিমধ্যে শূন্য পদ ও যোগ্য কমকর্তার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। অর্থাৎ এ ব্যাপারে পূর্ণ প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছিল।
কিন্তু এরই মধ্যে সেই চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ চক্র ‘পুল’ ব্যবস্থা বাতিল করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তারা বড় অংকের ‘বাজেট’ নিয়ে প্রভাবশালী মহলে ধর্ণা দিতে থাকে। অবশেষে তারা সফলও হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দুর্নীতিবাজ চক্রের প্ররোচনা ও চাপেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ১১ নভেম্বর আবার এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘পুল’ ব্যবস্থা বাতিল করে বিতর্কিত সেই পথই অনুসরণ করা হয়। অভিজ্ঞমহল মনে করছেন, এরফলে জিএম পদোন্নতিতে ঘুষ-দুর্নীতি আগের চেয়েও অনেক বেড়ে যাবে। দুর্নীতিবাজরা এখন দ্বিগুণ উৎসাহে অপকর্ম চালাবে। অন্যদিকে অদক্ষতার হাত থেকে পরিত্রাণের যে উদ্যোগ সেটিও ভেস্তে গেলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ‘পুল’ ব্যবস্থা বাতিল করার কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে সোনালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। কারণ, এই ব্যাংক দু’টিতে বর্তমানে জিএম পর্যায়ে যোগ্য কর্মকর্তার সংকট প্রকট। আগামীতে আরো তীব্রতর হবে। 
পুল-এর মাধ্যমে পদোন্নতির জন্য যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল তাতে দেখা যায়, জিএম পদ খালি আছে বর্তমানে ৫২টি। তারমধ্যে কৃষি ব্যাংকে ১২টি এবং সোনালী ব্যাংকে ৬টি। আগামী ৩০ জুন নাগাদ জিএম পদ খালি হবে ৮৪টি। তারমধ্যে ২৫টি পদ খালি হবে শুধু সোনালী ব্যাংকেই। কিন্তু তখন সোনালী ব্যাংকে জিএম পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য হবেন মাত্র ৯জন কর্মকর্তা। ‘পুল’ ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে অন্য ব্যাংকের যোগ্য কর্মকর্তারা পদোন্নতির মাধ্যমে এই ব্যাংকে পদায়ন করা যেতো। কিন্তু ‘পুল’ বাতিল করার কারণে এখন তা সম্ভব হবে না। সোনালী ব্যাংকে ডিজিএম দিয়েই জিএম’র কাজ চালাতে হবে। এতে সরকারের সর্ববৃহৎ এই ব্যাংকটির কর্মকা-ে স্থবিরতা নেমে আসবে নিঃসন্দেহেই। উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে নতুন জনবল নিয়োগের সময় সোনালী ব্যাংকে নিয়োগ করা হয়েছিল মাত্র ১শ’ জন, অন্যদিকে একই সময়ে জনতা ব্যাংকে নিয়োগ হয়েছিল ১১শ’। সেই সময়ের ব্যাচটিই বর্তমানে জিএম পদোন্নতির জন্য অপেক্ষমাণ।  
সোনালী ব্যাংকে ইতিপূর্বে শীর্ষ নির্বাহী পদে কাজ করেছেন, বর্তমানে অন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকে কর্মরত আছেন এমন একজন কর্মকর্তা শীর্ষকাগজের এ প্রতিবেদককে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, সোনালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে জিএম পর্যায়ে যোগ্য জনবলের যে সংকট প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে তা কাটিয়ে উঠার জন্য ‘পুল’ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘পুল’ ব্যবস্থা ব্যাংকিং সেক্টরে যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে পদোন্নতি-পদায়নেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৫ নভেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)



..........