মঙ্গলবার, ১২-নভেম্বর ২০১৯, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • জাপানে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু: সক্রিয় দালাল চক্র, প্রতারণার আশংকা

জাপানে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু: সক্রিয় দালাল চক্র, প্রতারণার আশংকা

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০৭:২৭ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: জনশক্তি রফতানির বাজারে বেশ কয়েক বছর ধরে মন্দাভাব যাচ্ছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশ থেকে যারা জনশক্তি নেয় সেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবগুলো দেশই বাংলাদেশের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা ব্রুনাইতেও জনশক্তি রফতানি নেই। এরমধ্যে আকারে ছোট হলেও একটা সুখবর এসেছে জাপান থেকে। বড় ধরনের কোনো খরচ ছাড়াই দক্ষ শ্রমিক হিসেবে জাপানে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। জাপানে কর্মী নিয়োগের সংবাদে ইতোমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা) ও তাদের সিন্ডিকেট, বাইরের দালাল-প্রতারক চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশিদের জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়ার কথা বলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে এরা। জাপানে বাংলাদেশিদের চাকরির কথা বলে এমন প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে ইন্টারনেটে। আগ্রহী ব্যক্তিদের টানতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করছে প্রতারকরা। শুধু শ্রমিক প্রেরণই নয়, উচ্চশিক্ষা এবং ছাত্রাবস্থায় পার্টটাইম চাকরি করার সুযোগ উল্লেখ করে বাংলাদেশি তরুণদের আকৃষ্ট করতে নানা লোভনীয় অফারও দেয়া হচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানির সাথে জড়িত কয়েকটি এজেন্সি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এর আগে ভুয়া কর্মসংস্থানের কথা বলে কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। সম্প্রতি জাপানের সাথে জনশক্তি রপ্তানি বিষয়ক একটি চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে জাপানে শ্রমের চাহিদা পূরণে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের কঠোর অভিবাসন নীতি শিথিল করে পার্লামেন্টে নতুন আইন পাস করা হয়। যেখানে প্রথম ধাপে বলা হয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ৩ লাখ ৪৫ হাজার শ্রমিক নেয়া হবে। কিন্তু তীব্র শ্রমিক সংকট থাকায় দ্বিতীয় ধাপে আরো বেশি শ্রমিক নেয়ার সিধান্ত নেয় দেশটি। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকেও শ্রমিক নেয়ার চুক্তি সই হয় দু’দেশের সরকারের মধ্যে। আর এর পরই তৎপর হয়ে উঠেছে জনশক্তি রফতানি খাতের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। আশংকা করা হচ্ছে, এদের হাতে হাজার হাজার মানুষ প্রতারিত হবে, যদি এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না হয়। তাতে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার জের হিসেবে এক পর্যায়ে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির এই বড় সুযোগটিই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই এখনই সরকারের এ ব্যাপারে কঠোর ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়া উচিত মনে করছেন অভিজ্ঞজনরা।
১৪টি খাতে যে পরিমাণ ভিসা দেবে জাপান
আইন শিথিল করার সময় শুরুতে জাপান সরকার বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৩ লাখ ৪৫ হাজার শ্রমিক নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে এই সিদ্ধান্ত আরো কিছুটা পরিবর্তন করে। জানানো হয়, আগামী পাঁচ বছরে শুধু বাংলাদেশ থেকেই ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪শ’ শ্রমিক নেবে জাপান।
নার্সিং কেয়ারে ৬০ হাজার, রেস্টুরেন্ট খাতে ৫৩ হাজার, কনস্ট্রাকশন খাতে ৪০ হাজার, বিল্ডিং ক্লিনিং খাতে ৩৭ হাজার, কৃষি খাতে ৩৬ হাজার ৫০০, খাবার ও পানীয় শিল্পে ৩৪ হাজার, সেবা খাতে ২২ হাজার, ম্যাটারিয়ালস প্রসেসিং খাতে ২১ হাজার ৫০০, ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি ৭ হাজার, ইলেকট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতিতে ৪ হাজার ৭০০, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ১৩ হাজার, মৎস্য শিল্পে ৯ হাজার, অটোমোবাইল মেনটেইনেন্স শিল্পে ২১ হাজার ৫০০, এয়ারপোর্ট গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং অ্যান্ড এয়ারক্রাফট মেনটেইনেন্স (এভিয়েশন) খাতে ২ হাজার ২০০ মিলিয়ে ৫ বছরের মধ্যে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি কর্মীকে ভিসা দেবে জাপান সরকার। কি পরিমাণ শ্রমিক যাবে সেটা নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রস্তুতির উপরে। 
জাপানে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণায়লেয় সংশ্লিষ্ট শাখার উপসচিব কাজী আবেদ হোসেন শীর্ষ কাগজকে বলেন, বিনা খরচে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক নেবে জাপান, এটা আমাদের জন্য ভাল খবর। এর আগে জাপানে আমাদের কর্মীর বাজার ছিল না। কিন্তু কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি জাপানে যেতে আগহী কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল। তার খবর আমরা জেনেছি। এবার আগের মতো জাপানে যেতে চাওয়া কোনো আগ্রহী কর্মীদের কাছ থেকে যাতে অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারে সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় সজাগ রয়েছে। আগ্রহী শ্রমিকদের সচেতন করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দিক নির্দেশনামূলক বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে। 
১১টি রিক্রুটিং এজেন্সি
জাপানে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন প্রেরণকারী এসও হিসেবে তালিকাভুক্ত ১১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে  অনুমোদন করে সম্প্রতি একটি তালিকা প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কাজী আবেদ হোসেন স্বাক্ষরিত ওই তালিকায় এক বছরের জন্য তাদেরকে কর্মী প্রেরণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এজেন্সিগুলো জাপানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী টেকনিক্যাল ইন্টার্ন পাঠাবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো হলো মেসার্স কেএম ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স আল খামিজ ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ, মেসার্স দ্য হিউম্যান রিসোর্স বাংলাদেশ, মেসার্স প্রোসার্চ রিক্রুটমেন্ট কনসালট্যান্টস, মেসার্স আহম্মদ অ্যান্ড কোম্পানি, মেসার্স শুভ্র ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড ট্রাভেলস, মেসার্স মিতুল ট্রেডিং, কেয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স এসএ ট্রেডিং ও মেসার্স গ্লোবাল রিক্রুটিং এজেন্সি।
যে ১১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের কাছে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা কতটুকু এই সম্পর্কে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণায়লের উপসচিব কাজী আবেদ হোসেন বলেন, যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি জাপানে কর্মী পাঠানোর জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে, সেগুলোর অতীতের পারফমেন্স যাচাই করে। দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের সেবার মানসহ বেশ কয়টি ক্যাটাগরিতে যাচাই-বাচাই করে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো কর্মীর কাছ থেকে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই, মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া নিয়মের বাহিরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে না পারে তা দেখভালের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি টিম থাকবে। কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি যদি মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেয়া নিয়মের বাহিরে যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে তৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযুক্ত কোম্পানিকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সকল প্রক্রিয়া থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সহ লাইসেন্স বাতিল করা হবে। বিশেষ করে জাপান যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার ও মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সিরিয়াস। তাই জাপান যেতে আগ্রহী কর্মীরা পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন।
তবে মন্ত্রণালয়ের এমন আশ্বাস এবং প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না বিদেশ গমনেচ্ছুরা। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, হাজার হাজার মানুষকে সর্বশান্ত করার পর শুধু ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করাই একমাত্র শাস্তি হতে পারে না। একবার লাইসেন্স বাতিল করা হলে এরা আবার অন্য লাইসেন্সে কাজ করার সুযোগ পায়। তাই জেল-জরিমানাসহ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। পাশাপাশি র‌্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
জনশক্তি রপ্তানি এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রা’র একাধিক সদস্য শীর্ষকাগজের এই প্রতিবেদককে বলেন, বিদেশে কর্মী রপ্তানির নতুন বাজার এখন সৃষ্টি হচ্ছে না। যে কয়টি দেশ শ্রমিক নিচ্ছে তারা আগের মতো আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সৌদি আরব বিনা নোটিশে বৈধ শ্রমিকদের গ্রেফতার করে দেশে পাঠাচ্ছে। কারো কথাতেই কান দিচ্ছে না দেশটি। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সির দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে কর্মী নিয়োগ বন্ধ ঘোষণা করেছে সেখানকার বর্তমান মাহাথির সরকার। নিবে নিবে করেও কর্মী নিচ্ছে না। একের পর এক নতুন নতুন কঠিন শর্ত আরোপ করছে দেশটি। প্রতি দিন অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে প্রবাসী কর্মীদের। অনেকে ভিসা জটিলতা ও কাজ না পেয়ে জঙ্গলে মানবতার জীবন-যাপন করছে। ইউরোপের বাজারও ভালো না, নতুন কোনো দেশ শ্রমিক নেয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাছে না। এমন দুরাবস্থায় জাপান আমাদের দেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। খুব ভাল কথা। আর পাঁচটি দেশের মতো জাপান নয়। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আমাদের জাপানে পাঠাতে হবে। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। সরকারকে ও বায়রাকে অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যপারে সচেতন থাকতে হবে। নিখুঁত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাপানের দৃষ্টি আর্কষণ করতে হবে। সেদেশে আস্তে আস্তে কর্মী রপ্তানির বাজারটি সম্প্রসারণ করতে হবে। আর তা করতে না পারলে মালয়েশিয়ার মতো হলে বিপদ আমাদের অনিবার্য। দক্ষ, অদক্ষ কর্মীর অভাব আমাদের নেই। তাই জাপানের বাজার ধরে রাখতে পুরো প্রক্রিয়া অনিয়ম মুক্ত রাখতে হবে বলেও মনে করেন তারা।
স্পেসিফায়েড স্কিলড ভিসা ক্যাটাগরি-১
জাপান সরকারের স্পেসিফায়েড স্কিল ভিসা ক্যাটাগরি-১ অনুযায়ী ১৪টি খাতের কর্মীরা ৫ বছরের জন্য ভিসা পাবেন। আবেদনকারীকে এই ক্যাটাগরির ভিসার জন্য জাপানি ভাষায় পরীক্ষা এবং দক্ষতার পরীক্ষা দিতে হবে। এই ভিসার আওতায় কর্মীরা তাদের পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। এই ক্যাটাগরির ভিসা সীমিত সময়ের জন্য নবায়ন করা যাবে। কিন্তু দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ভিসায় পরিবর্তন করার জন্য সময় বাড়ানো হবে না। জাপানের ইমিগ্রেশন বিভাগ জানায়, প্রথম বছরে এই ক্যাটাগরিতে ৪৭ হাজার ৫৫০টি ভিসা দেওয়া হবে। বাকিগুলো আগামী ৫ বছরব্যাপী দেওয়া হবে। এই ক্যাটাগরিতে শুধু নার্সিং কেয়ার খাতেই ৬০ হাজার ভিসা দেওয়া হবে।
স্পেসিফায়েড স্কিলড ভিসা ক্যাটাগরি-২ 
দ্বিতীয় ক্যাটাগরির এই ভিসায় আবেদনের জন্য কর্মীর ক্যাটাগরি-১ ভিসা থাকতে হবে। এই ভিসার আবেদন নেওয়া শুরু হবে ২০২১ সাল থেকে। যারা তাদের কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, তারা এই ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে, শুধু কন্ট্রাকশন ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের কর্মীরা এই সুযোগ পাবেন। এই ভিসার আওতায় কর্মীরা তাদের পরিবারের সদস্যদের জাপানে নিয়ে যেতে পারবেন। এমনকি টানা ১০ বছর সেখানে থাকার পর জাপানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিও পাবেন।
যে কারণে শ্রমিক নেবে জাপান
অন্য দেশ থেকে জাপান বিশ্বের একমাত্র উন্নত দেশ যেখানে অভিবাসনের ব্যাপারে বেশি কড়াকড়ি। জাপানের জন্ম হার গত শতকের ৭০ দশক থেকে দুই দশমিক একের নিচে। তখন থেকে জাপানের জনসংখ্যা কমছে। বর্তমানে এই হার এক দশমিক চার। এর বিপরীতে জাপানে মানুষের গড় আয়ু বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। এই কারণে জাপানে কর্মক্ষম মানুষের মারাত্মক সংকটে। কৃষি জমিতে ধান চাষ, সবজি চাষ, জমি চাষাবাদের কাজ করতে হয় আশিরও বেশি বয়সের বৃদ্ধদের। যেখানে এই বয়স্ক লোকগুলো নিজেই চলাফেরা করতে পারেনা, শ্রমিক সংকটের ফলে তাদের চাষাবাদ করতে হচ্ছে। তাই এসব মানুষের সেবার জন্য দক্ষ জনবল দরকার। তবে বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার ব্যাপারে জাপান বরাবরই রক্ষণশীল। জাপানের ব্যবসায়ীরা বহু বছর ধরেই যুক্তি দিচ্ছেন যে বিদেশ থেকে কর্মী আনার জন্য ইমিগ্রেশন আইন শিথিল করা দরকার। বিশেষ করে এই সব কারণে জাপানে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান সরকার।
সম্ভাব্য আয়
একজন শ্রমিকদের বেতন নির্ভর করবে কোন শ্রমিক কোন ধরণের কাজে নিয়োগ পাচ্ছে তার উপর। তবে এক জন দক্ষ শ্রমিক হিসেবে জাপানে যাওয়ার পর কাজের ধরণ ভেদে প্রতি মাসে বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় থেকে শুরু করে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের সুযোগ রয়েছে। জাপানের শ্রম আইন অনুযায়ী, একজন কর্মীর ন্যূনতম বেতন বাংলাদেশি মুদ্রায় ঘণ্টায় প্রায় ৭০০ টাকা। প্রত্যেক কর্মী দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারবেন। তবে, কিছু কিছু খাতে সপ্তাহে ৪৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করার সীমাবদ্ধতা আছে। সে হিসাবে একজন কর্মীর মাসিক বেতন হবে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। জাপানে এখন ১৫-১৬ হাজার বাংলাদেশি এখন অবস্থান করছেন। যারা মূলত অপেক্ষাকৃত উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন কর্মী। তথ্য প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এসব খাতে বেশ কিছু বাংলাদেশি কাজ করছেন এবং এসব খাতে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে পাঁচবছর মেয়াদের নিয়োগ নিয়ে কাজের সুযোগ আগের মতই অব্যাহত রয়েছে। 
শারীরিক যোগ্যতা
দক্ষ শ্রমিক হিসেবে জাপানে যেতে হলে বয়স কোনভাবেই ৩২ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে কোন ধরণের রোগ রয়েছে কিনা সেটিও নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া চারিত্রিক সনদ অর্থাৎ কোন আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোন ধরণের অভিযোগ রয়েছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। 
পেশাগত দক্ষতা
জাপানে যেতে হলে প্রথমেই দক্ষতার পরীক্ষা দিতে হবে। দক্ষতায় টিকে গেলে শুরু হবে ভাষা শেখা। যারা এরইমধ্যে বিভিন্ন পেশায় রয়েছেন এবং যাদের পেশাগত কাজের সার্টিফিকেট রয়েছে তারা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গণ্য হবেন। তবে যাদের দক্ষতা রয়েছে কিন্তু সার্টিফিকেট নেই তারা পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট নিতে পারবেন। একজন কর্মীকে কমপক্ষে এইচএসসি পাশ হতে হবে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা যাবে। নার্সিং ইন্সটিটিউটগুলোতে সেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কৃষিকাজের ক্ষেত্রে যারা বিভিন্ন ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন এবং সার্টিফিকেট রয়েছে তারা যেতে পারবেন। এছাড়া বিভিন্ন ইন্সটিটিউটে কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েও সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা যাবে। তবে জাপানে বিদেশিদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো জাপানি ভাষা শেখা। জাপানে যেতে হলে জাপানি ভাষা জানতে হবে। এজন্য জাপানি ভাষার এন ফোর লেভেল পর্যন্ত জানতে হবে। জাপানি ভাষায় এন ফাইভ হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়। অর্থাৎ জাপানি ভাষায় বলতে, লিখতে ও পড়তে জানতে হবে। জাপানে যেতে হলে জাপানি ভাষা জানার সর্বনিম্ন স্ট্যান্ডার্ড এটি। এর পরে এন থ্রি বা এন টু জানলে সেটাকে অতিরিক্ত যোগ্যতা বলে ধরা হবে। এছাড়া জাপানে যাওয়ার পরও নিয়মিত ভাষার বিষয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকবে। তা ছাড়াও জাপানের জীবনযাত্রার সাথে মানিয়ে নেবার জন্য অন্যান্য কিছু ‘লাইফ স্কিল’ এবং ‘কর্মসংস্কৃতি’ সম্পর্কেও তাদের অবহিত হতে হবে।
আবেদনের পদ্ধতি
প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাপানে শ্রমিক পাঠিয়ে থাকে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি। এছাড়া জাপান সরকারের সাথে হওয়া নতুন জনশক্তি রপ্তানি চুক্তির আওতায় এরইমধ্যে ১১টি সংস্থাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব সংস্থার যোগ্যতা হলো বাংলাদেশ ছাড়াও জাপানে তাদের অফিস রয়েছে। এদের অনেকেই এরই মধ্যে ভাষা শেখানোর কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণায়লয়ের এক কর্মকর্তা শীর্ষ কাগজকে জানান, পেশার দক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে ভাষা শেখার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে না। পেশাগত দক্ষতা এবং ভাষা শিক্ষা শেষে চূড়ান্ত বাছাই অনুষ্ঠিত হবে জাপান দূতাবাসে। সেখানে তাদের অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে সব ধরণের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। অনুমোদিত সংস্থাগুলো থেকে জাপানি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের জন্য কিছু পরিমাণ ফি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে অনিয়ম করার সুযোগ নেই। তবে কেউ দলাল ও দুর্নীতিবাজচক্রের প্রতারণার ফাঁদে পা দিলে সেটি ভিন্ন কথা।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব বলছে, গত বছর মাত্র ১৬৩ জন শ্রমিক জাপানে পাঠাতে পেরেছে বাংলাদেশ। চলতি বছর ৪০০ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও জুলাই পর্যন্ত গিয়েছেন ১১৯ জন। আরও প্রায় এক হাজার কর্মীর ভাষা প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলার ২৭টি কেন্দ্রে ৪০ জন করে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বিএমইটি। চার মাস মেয়াদি জাপানি ভাষা শেখার এসব প্রশিক্ষণের পর পরীক্ষায় বসেন কর্মীরা। উত্তীর্ণ হলে আইএম জাপানের ব্যবস্থাপনায় আরও চার মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষানবিশ হিসেবে তাদের জাপানে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য দেশের মতো জাপানে কর্মী রপ্তানির ক্ষেত্রে যেন অনিয়ম না হয় সে ব্যপারে সকলকে সচেতন থাকার কথা বারবার বলেছেন অভিজ্ঞজনরা।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৮ অক্টোবর ২০১৯ প্রকাশিত)