সোমবার, ১৮-নভেম্বর ২০১৯, ১১:১৮ অপরাহ্ন
টিআইবির প্রতিবেদন

ভূমি নিবন্ধন অফিস দুর্নীতিতে নিমজ্জিত

shershanews24.com

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ভূমি নিবন্ধনে দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগ দেশের মানুষের মুখে মুখে। ভূমি নিবন্ধনে ঘুষ দিতে হয়নি বা দুর্নীতির শিকার হতে হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ভূমি নিবন্ধন আর দুর্নীতি একে অপরের পরিপূরকে পরিণত হয়েছে, সম্প্রতি টিআইবি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন ধারণা দেয়া হয়েছে। 
গত ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ভূমি নিবন্ধন অধিদফতর ও নিবন্ধন অধিদফতরের দুর্নীতি আর অনিয়মের নানাদিক তুলে ধরে দুর্নীতিবিরোধী বৈশি^ক সংস্থাটি। ভূমি নিবন্ধনে দুর্নীতির খাতওয়ারি চিত্র তুলে ধরেছে টিআইবি। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলিলের নকল তোলার জন্য সেবাগ্রহীতাদের ১ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা দিতে হয়। দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূতভাবে লেনদেন হয়। 
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবায় সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ খাতে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায় ও ঘুষ নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে, এখানে কিছু ব্যতিক্রম বাদে হয়রানি বা জিম্মি করে অর্থ আদায় নিয়মিত ঘটনা, দুর্নীতির মহোৎসব চলছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। ভূমি নিবন্ধন আর দুর্নীতি সমার্থক হয়ে গেছে। এখানে নিয়োগ আর পদোন্নতিতেও দুর্নীতি ব্যাপকতা পেয়েছে বলেও মনে করে টিআইবি। 
দেশের আটটি বিভাগের ১৬টি জেলায় ৪১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নেয়া তথ্য এবং জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধন অধিদফতর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, অংশীজন ও সুবিধাভোগীদের মতামত নেয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত এ জরিপ চালানো হয়।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহীতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সবচে’ উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ২০১৭ সালেও টিআইবি ভূমিখাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল। ইফতেখারুজ্জামান জানিয়েছে, দুই বছরে অবস্থার কোন উন্নতি তো হয়ইনি বরং অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ অবনতি হয়েছে।
ভূমি অফিসের লোকবল নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিবেচনা যথেষ্ট প্রভাব ফেলে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে টিআইবির প্রতিবেদনে। টিআইবি জানিয়েছে, বাংলাদেশে ভূমি নিবন্ধনে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার ব্যাপক প্রবণতা রয়েছে। সাধারণতঃ জমির মূল্য কম দেখিয়ে নিবন্ধন করা হয়, আবার উল্টোচিত্রও আছে, ব্যাংকঋণ পেতে অনেক সময় কম দামি জমি বেশি দাম দেখিয়েও নিবন্ধন করা হচ্ছে। এতে রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরতরা লাভবান হয়, তবে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
টিআইবি বলেছে, একজন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলির ক্ষেত্রে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির বিষয়টি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিষয়। ঢাকা মহানগরীতো বটেই ঢাকার আশপাশে অর্থাৎ সাভার, কেরানীগঞ্জ এসব এলাকায় এ ধরণের পদে বদলির বিষয়টি কোটি টাকার ব্যাপার। রাজধানীর আশপাশের এলাকা অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ এসব এলাকায় সাব রেজিস্ট্রার বদলির বিষয়টিও কখনো কখনো কোটি টাকার বিষয়। আর এসব স্থানে থাকার ক্ষেত্রে বড় অংকের মাসোহারা দেয়ার বিষয়টিও ‘ওপেন সিক্রেট’। শুধু টাকারই বিষয় নয়, শিল্প ও আবাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় এসব এলাকায় সাব রেজিস্ট্রার পদে কে থাকবেন আর কারা চাকরি করবেন তা রীতিমত রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে এসব এলাকায় এ ধরণের অফিসের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আরো কিছু দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে টিআইবি। প্রত্যক্ষ না হলেও এসব দুর্নীতির পরোক্ষ ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে। এসবের মধ্যে রয়েছে দলিল লেখকদের লাইসেন্স পাওয়ায় তিন লাখ, সমিতিতে নাম লেখাতে তিন লাখ টাকা করে দিতে হয়। সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভেদে এর পরিমাণ আরো বেশিও হয়। টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নকলনবিস থেকে মোহরার পদে যোগদান করতে আট লাখ টাকা বা তারও বেশি ঘুষ দিতে হয়। 
টিআইবি’র প্রতিবেদনে ভূমিখাতে প্রতিটি ধাপে অংশীদারিত্ব ও পরস্পরের যোগসাজশে দুর্নীতি হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। টিআইবি জানিয়েছে, নিয়ম বহির্ভূত অর্থ আদায়ের পর ভূমি অফিসের সবাই পদ অনুযায়ী এ টাকার ভাগ পান। অনিয়মের মাধ্যমে দিনে যে পরিমাণ টাকা আদায় করা হয় তার অর্ধেক পান সাব রেজিস্ট্রার। আর বাকি টাকা অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়। অবশ্য সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভাগাভাগির বিষয়টা শুধু অফিসের মধ্যেই সীমিত থাকে না, অনেক ক্ষেত্রে এ টাকা নিচ থেকে উপরের দিকে প্রধান কার্যালয়ে, এমনকি মন্ত্রণালয়েও যায়।
দলিল নিবন্ধনে সেবাগ্রহীতাদের একাধিকবার ঘুষ দেয়ার অভিযোগও পেয়েছে টিআইবি’র গবেষক দল। নির্ধারিত সময়ে দলিল পাওয়া, দলিল নিবন্ধন ও দুর্নীতি একটি আরেকটির পরিপূরক হয়ে গেছে। টিআইবি বলছে, বাংলাদেশে ভূমি নিবন্ধনে করের হার বেশি। ভারতে জমি নিবন্ধন ফি ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ আর বাংলাদেশে এর পরিমাণ ১০ দশমিক ২ শতাংশ। নিবন্ধন ফি বেশি হওয়ায় মানুষের মধ্যে ফি কমাতে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া একেবারে সাদামাটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেছেন, জমি সংক্রান্ত নিবন্ধনের কাজটি করে রেজিস্ট্রি অফিস। দেশের রেজিস্ট্রি অফিস হচ্ছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন, অথচ জমির আর সব কাজই ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন। দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে মানুষকে দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে।  
অবশ্য এই প্রক্রিয়ায় সমন্বয় আনার কথা বলেছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান পাটোয়ারি। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ভূমি সংক্রান্ত সব কাজ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীমূলকভাবে করতে হবে। এজন্য আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে জানিয়ে ভূমি সচিব বলেন, সমন্বয় ছাড়া বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবে আইন সচিব মো: গোলাম সারওয়ার মনে করেন, ঢালাওভাবে দুর্নীতি হচ্ছে না, বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ঘটলে এবং তা সরকারে নজরে এলে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু আইন সচিবের এমন বক্তব্যকে সচেতন মানুষদের কেউই বিশ^াস করেন না।
ভূমিনিবন্ধনে দুর্নীতি রোধে করণীয়র ব্যাপারে কিছু সুপারিশ ও পরামর্শও তুলে ধরা হয়েছে টিআইবির প্রতিবেদনে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক এ সব সুপারিশ তুলে ধরে বলেছেন, দুর্নীতি বন্ধ করার ক্ষেত্রে সবচে’ বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা। দুর্নীতিতে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরতদের সম্পদের হিসাব নেয়ার সুপারিশও করেছে টিআইবি। 
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, টিআইবির প্রতিবেদনটি ভূমি অফিসের দুর্নীতির আইসবার্গের দৃশ্যমাণ অংশমাত্র। এ খাতে যে দুর্নীতি হয় বা ঘুষ দেয়া হয় তা দিতে সেবাগ্রহীতারা বলা যায় এক প্রকার বাধ্য। তবে সেবাগ্রহীতারাও নিজেদের সুবিধার জন্য অনেক সময় দুর্নীতির পথ ধরেন। কেন না, জমির দাম কমিয়ে যখন নিবন্ধন করা হয় তখন একজন ক্রেতা কম খরচে নিবন্ধনের কথা ভেবেই তা করেন। অভিজ্ঞ মহলের পরামর্শ, ভূমি নিবন্ধনে যে জটিলতা ও প্রক্রিয়া তা আরো সহজ করতে হবে, একই সাথে মানুষের মধ্যে সততার ধারণা আরো জোরালো করতে অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত ফি দিয়েই রেজিস্ট্রেশন করতে এবং জমির বিদ্যমান নিবন্ধন ফির পরিমাণ নিয়েও ভাবতে হবে সরকারকে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)