সোমবার, ১৪-অক্টোবর ২০১৯, ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন

‘রাতের ভোট’ এবং ‘শতকরা ১০০ ভাগ’ ভোট বিতর্ক

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৩ জুলাই, ২০১৯ ০৫:৫৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক যেন পিছুই ছাড়ছে না। ‘রাতের ভোট’ হিসেবে ব্যাপকভাবে চিহ্নিত এই নির্বাচনের বিষয়টি আবার সামনে এসেছে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অনেকগুলো কেন্দ্রে শতকরা একশ’ ভাগ ভোট পড়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে উঠে আসায়। কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ১৯৭টি কেন্দ্রে শতকরা একশ’ ভাগ ভোট পড়েছে। ওই নির্বাচনটা যে আসলে কেমন হয়েছে তার প্রতিচ্ছবি অনেকটা পরিষ্কার হয় এই একশ’ ভাগ ভোট পড়ার ঘটনায়। 
বাংলাদেশে নির্বাচনের যে উৎসবমুখর পরিবেশ তা মানুষের আত্মস্থ হতে শুরু করে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ভোট আর নির্বাচনী ব্যবস্থার বিষয়ে মানুষকে আবার বিমুখ করে তুলেছে। শুধু তাই নয়, গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও দেশের মানুষকে অনাগ্রহী ও সংশয়াচ্ছন্ন করে তুলেছে। যার প্রমাণ মিলেছে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে। এই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করতে নির্বাচন কমিশন অনেক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও নির্বাচনী আবহ তৈরির জন্য ভাইস চেয়ারম্যানের পদটিতে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে উন্মুক্ত করে দেয়, যাতে নেতারা এ পদে নির্বাচন করা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যাপকহারে প্রতিযোগিতায় নামেন। তবে পাঁচদফায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচন কার্যকর বা অর্থবহ কিছুই হয়নি, বরং নির্বাচন কমিশনের অযোগ্যতা এবং মেরুদ-হীনতার বিষয়টিই জনগণের সামনে পরিষ্কার হয়েছে। এরইমাঝে জাতীয় নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় ৩০ ডিসেম্বরের ’রাতের ভোট’ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৯৭ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট!
৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিস্তারিত সম্প্রতি নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এতে দেখা যায়, ১৯৭টি কেন্দ্রে শতভাগ, ১ হাজার ৮৮৯টি কেন্দ্রে শতকরা ৯৫ ভাগ থেকে ৯৯.৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে। ইসি কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, শতকরা ১শ’ ভাগ ভোট পড়লেও সব বৈধ ভোট হয়নি, কিছু ভোট বাতিল হয়েছে। তবে কিছু ভোট বাতিল হওয়ার ঘটনা কিন্তু শতকরা ১শ’ ভাগ ভোট পড়ার বিষয়টিকে লঘু করতে পারে না। কেন না শতকরা ১শ’ ভাগ ভোট পড়লে তাতে কিছু ভোট যেমন বাতিল হয়েছে, তেমনি ভোট যদি শতকরা ১০ শতাংশও পড়ে তারমধ্যেও কিছু ভোট বাতিল হতে পারে, মূল প্রশ্নটা শতকরা ১শ’ ভাগ ভোট গৃহিত হলো কিভাবে? তবে কি ’সিল মারো ভাই সিল মারো’র জোয়ারে মশগুল ব্যক্তিরা ভুলেই গিয়েছিলে যে, ভোটার তালিকায় নাম আছেন এমন কেউ এরইমধ্যে মারাও যেতে পারেন, কেউ বিদেশ থাকতে পারেন এমনকি অনেকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য থাকতে পারেন অন্যস্থানে। এমনও অভিযোগ আছে কোন কোন কেন্দ্রে গৃহীত ভোটের যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে তা ওই কেন্দ্রে পাঠানো ব্যালট পেপারের চে’ বেশি! 
ইসি প্রকাশিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পূর্ণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩শ’ আসনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯জন। ৩০ ডিসেম্বর ভোট হয় ২৯৯টি আসনে। ইসির তথ্য হচ্ছে এ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৮ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১টি। অর্থাৎ ভোট পড়ার হার ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। ৩০ ডিসেম্বর শতকরা ৮১ ভাগ ভোট পড়েছে এ কথা দেশের মানুষকে বিশ^াস করানো শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে। 
ওই নির্বাচনের পর টিআইবি জানিয়েছিল, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৫০টি আসনের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর এক পরিবীক্ষণে তারা ৪৭টি আসনেই অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। টিআইবি’র পরিবীক্ষণেও রাতের বেলায় ব্যালটে সিল মারার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআই’বির প্রতিবেদনে যে তথ্য মিলেছে তা এই নির্বাচনের ব্যাপারে দেশের মানুষের ধারণারই প্রতিফলন। নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফলাফলের চিত্রেও এখন সেটিই প্রতিষ্ঠিত হলো।
কি বলছেন সিইসি! কি করবে কমিশন?
একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে গোড়া থেকেই সমালোচনার মুখোমুখি হয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন। কেএম নূরুল হুদার রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি তিনি নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই সর্বমহলে আলোচিত হয়। বিএনপি নূরুল হুদার ব্যাপারে নেতিবাচক থাকলেও শেষাবধি গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং ভোটের রাজনীতি ফিরে আসবে এই প্রত্যাশা থেকেই তাকে মেনে নেয়, কিন্তু হুদা কমিশন কখনোই বিএনপিকে আস্থায় নেয়ার চেষ্টা করেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল কলের পুতুলের মতো, মানে সুতো যেমন নাড়ানো হয়েছে পুতুলও তেমনি নেচেছে।
ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সাথে আলোচনাকালে নূরুল হুদা ব্যক্তিগতভাবে কটাক্ষ করেছিলেন ড. কামাল হোসেনকে। ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার ব্যাপারেও তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। এতসব সত্ত্বেও শেষাবধি নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যায় বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপির অভিযোগ, প্রায় সব আসনে আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা হয়েছিল। আগের রাতে ভোট নেয়ার পর পরের দিন ভোটের সাজানো নাটক করা হয়েছে। সরকার বা কমিশনের ওপর আস্থা রাখা যে কারণেই হোক বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সরকার ও কমিশন বিএনপিকে দেয়া কোন কথাই রাখেনি।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতারিত হওয়ার বেদনা শুধু বিএনপিরই নয়, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরিহাসমূলক ফলাফল দেশের গণতন্ত্রকে অনেক দূর ছিটকে ফেলেছে এমনটাই মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। শুধু বিশ্লেষকরাই নন, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারও এই ধারণাপোষণকারীদের একজন। সদ্যসমাপ্ত উপজেলা নির্বাচনের পর তিনি বলেছেন- একতরফা নির্বাচনের কারণে ভোটাররা ভোট দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, ভোটারদের নির্বাচনবিমুখীতা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। 
যাইহোক শতভাগ ভোট নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে এ নিয়ে মুখ খোলেন খোদ সিইসি নূরুল হুদা। রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, শতকরা একশ’ ভাগ ভোট পড়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক। তবে এ নিয়ে তাদের এখন আর কিছু করার নেই, কেউ চাইলে বিষয়টি নিয়ে আদালতে যেতে পারেন, এ বিষয়ে কিছু বললে এখন আদালত বলতে পারে। কেএম নূরুল হুদার এ মন্তব্য যে তার দায় এড়ানোর চেষ্টা তা সহজেই বোঝা যায়, অনেকে মনে করেন সিইসি নিজের ঘাড়ের বোঝা আদালতের দিকে ঠেলে দিতে চান। 
শতকরা একশ’ ভাগ ভোটের ব্যাপারে কমিশনের আর কিছু করার নেই, এটা বলে নূরুল হুদা প্রকারান্তরে নির্বাচনী দুর্নীতিকেই প্রকাশ্যে প্রশ্রয় দেয়ার ঘোষণা দিলেন বলেই মনে হয়। অবশ্য ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে যা হয়েছে তাতে কিছু ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া বা না দেয়াটা তেমন বড় কোন বিষয় নয়, নির্বাচন কমিশন হয়তো এসব বিষয়কে সামনে এনে ৩০ ডিসেম্বরের ‘রাতের ভোট’ নিয়ে বিতর্কে আর ঘি ঢালতে চায়নি, বিষয়টিকে চেপে যাওয়ার নীতিকেই শ্রেয় মনে করেছে। 
সত্যিই কি কিছু করার নেই কমিশনের? আদালত কী বলেন?
দেশের সব ধরণের সাংবিধানিক ও স্থানীয় সরকার সমূহের নির্বাচন করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করতে যা করার কমিশন তা করবে এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে আরো নির্দিষ্ট করে বললে, সরকার কমিশনের কাজে সব রকম সহায়তা দেবে। আমাদের সংবিধান নির্বাহী বিভাগের জন্য এমন বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট হয়ে যাওয়ার পর কমিশনের কিছু করার নেই, এ কথাও ঠিক নয়- দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে ষ্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন যদি কোন নির্বাচন সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত হয়নি বলে মনে করে তাহলে তারা সে নির্বাচন বাতিল করতে পারে এবং নতুন করে নির্বাচন দিতে পারে। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী মামলার রায়ে সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে- গেজেট হওয়ার কথা বলে বিতর্কিত নির্বাচন মেনে নেয়ার কোন সুযোগ নেই এবং কমিশন যদি কোন নির্বাচন সুষ্ঠু বা গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে মনে করে তাহলে সে নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কমিশনের রয়েছে। 
তবে হুদা কমিশনের কাছ থেকে এমনটা কেউই আশা করে না। কেন না, তিনি তো আগেই বলেছেন, আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী এবং তাদের কি করা যাবে তা বলার সুযোগ নির্বাচন কমিশনের নেই। সবমিলিয়ে যে কারোই মনে হবে, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে কমিশনকে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ সব ধরণের সহায়তা দেবে এটা বলা হলেও হুদা কমিশনের ক্ষেত্রে বিষয়টা হয়েছে আসলে উল্টো, এ কমিশন রাতের ভোট করার ক্ষেত্রে সরকারকেই সবধরণের সহায়তা দিয়েছে।
৮৮৯ কেন্দ্রে ধানের শীষে একটি ভোটও নেই! 
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জামানত হারানোর দিক থেকেও অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এই নির্বাচনে ১ হাজার ৮শ’ ৫৫জন প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৪শ’ ২২জন প্রার্থীই তাদের জামানত হারিয়েছেন। অর্থাৎ জামানত রক্ষা হয়েছে ৪শ’ ৩৩ জন প্রার্থীর, এরমধ্যে যিনি বিজয়ী হয়েছেন তার জামানত নিয়ে কথা বলা অবান্তর, সে সংখ্যা অর্থাৎ ২৯৯জনকে বাদ দিলে দেখা যায় বিজয়ীরা বাদে জামানত রক্ষা পেয়েছে মাত্র ১শ’ ৩৪জন প্রার্থীর। তার অর্থ দাঁড়ায় দ্বিতীয় স্থানের অর্থাৎ নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ১শ’ ৬৫জনের জামানত রক্ষা হয়নি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দীরাই যদি জামানত রক্ষা না হয় তাহলে অন্য প্রার্থীদের ভোটের অবস্থা যে কতটা শোচনীয় ছিল তা সহজেই অনুমেয়।  
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন মাত্র সাতজন, এরমধ্যে পাঁচজন বিএনপির আর দুইজন গণফোরামের। বিএনপির ২৫৬জন প্রার্থীর মধ্যে ১৫২জনই জামানত হারান। এ নির্বাচনে ৮৮৯ কেন্দ্রে ধানের শীষে কোন ভোটই পড়েনি, অনেক আসনে বিএনপির চে’ আওয়ামী লীগ ১০ গুণ বেশি ভোট পেয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটের এমন পার্থক্য মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
জামানত হারানোর দিক থেকে সবচে’ বড় সংখ্যাটি হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন এ দলটি হাতপাখা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করে এবং একক দল হিসেবে সর্বাধিক আসনে অর্থাৎ ২৯৭ আসনে ছিলেন হাতপাখার প্রার্থী, তাদের মধ্যে একজন বাদে সবাই অর্থাৎ ২৯৬জনই জামানত হারিয়েছেন।  বিএনপির বর্জন করা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৩শ’ আসনের মধ্যে ২৩৪টি আসন পেয়েছিল আওয়ামী লীগ, এরমধ্যে ১৫৩টি আসনই তারা পায় বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৫৯ আসন, অর্থাৎ দশম সংসদের চে’ আওয়ামী লীগের আসন বেড়েছে ২৫টি। 
আওয়ামী লীগের এই আসন বৃদ্ধিকে যদি দলটির নেতা-কর্মীরা তাদের দলের প্রকৃত অর্জন মনে করতেন তাহলে তা সুখবর হতো এ দলটির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- মহাবিতর্কিত এ নির্বাচনের কারচুপি যেমন চেপে যেতে চায় ইসি তেমনি এ নির্বাচন নিয়ে আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চান আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাও। 
মধ্যরাতের ভোট রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন
মধ্যরাতের নির্বাচনের ব্যাপারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতারা শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন। তবে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন সরকারি দলের নেতারা, অনেকে বলেন, সরকারি দলের পক্ষেই এত বড় ’জয়’ হজম করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর মাধ্যমে নিজেদের জয় নিশ্চিত করাটাই ছিল আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে সেখানে এমন ‘ভূমিধস’ জয় তাদের জন্য উল্টো বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
জাসদের মূল্যায়ন: ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের অংশীদারদের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয় মহাজোটের শরীক দল জাসদ। ফেব্রুয়ারিতে জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সভায় একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে পর্যালোচনা করা হয়। জাসদের পর্যালোচনায়ও রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারার বিষয়টি উঠে আসে। জাসদ বলেছে- জনগণ ও রাজনৈতিক দল আশা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও নির্বাচনের পর গোটা জাতি বিষণœ হয়ে পড়ে। অবশ্য জাসদ ভোট নিয়ে এই কর্মকা-ের জন্য দায়ী করেছে প্রশাসনকে। তারা বলেছে, প্রশাসনের একশ্রেণির অতি উৎসাহী অংশ ভোটের আগের রাতেই ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্সভর্তি করে রাখাসহ নানা অনিয়ম করেছে। 
জাসদের এ বক্তব্যে নির্বাচন নিয়ে কিছুটা সমালোচনা হয়তো দেখা যায় তবে এই নির্বাচনের কুশীলব হিসেবে তারা যাদের দিকে আঙ্গুল তুলেছে সেই প্রশাসন কাদের নির্দেশে এমনটা করেছেন সে কথা বলেনি জাসদ। সম্ভবত: ক্ষমতার ভাগীদার হতে না পারা মনোক্ষুণœ জাসদ নেতারা সমালোচনার এ আসল জায়গাটা হাতে রেখেছেন ভবিষ্যতে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবেই। 
রাশেদ খান মেনন: বর্তমান সরকারের সাথে দীর্ঘদিনের গাটছড়া বাধা যে রাশেদ খান মেনন, তিনিও উপজেলা নির্বাচন শুরুর আগে ভোট নিয়ে নিজের শংকার কথা প্রকাশ করেছিলেন। বরিশালে এক অনুষ্ঠানে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেনন বলেছিলেন, উপজেলা নির্বাচনে এবার রাতের বেলায় ভোট হবে না, এখন দিনের বেলাতেই হবে ভোট ডাকাতি। গত নির্বাচনে তো রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা হয়েছে আগামীতে দিনের বেলায়ই ভোট ডাকাতি হবে। 
শরীফ নূরুল আম্বিয়া: জাসদ নেতা শরীফ নূরুল আম্বিয়া গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ভোটের আগের রাতেই ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ব্যালটবাক্স ভর্তি করে রাখাসহ নান অনিয়ম ঘটেছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বাম জোট বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, জনগণের ট্যাক্সের টাকা অপচয় করে নির্বাচনের নামে জনগণের সঙ্গে তামাশা বন্ধ করতে হবে। সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, নৈশ ভোটে নির্বাচিতদের ট্যাক্স ধার্য করার অধিকার নেই। তিনি বলেন, এ সরকার প্রতিনিধিত্বশীল সরকার নয়, তাই জনগণের ওপর ট্যাক্স ধার্য করার নৈতিক অধিকার এদের নেই।
পরোক্ষ স্বীকারোক্তি আওয়ামী লীগের
আওয়ামী লীগ নেতারা এ নির্বাচনের ব্যাপারে শুরু থেকেই অনেকটা নির্বাক। তারপরও তাদের কথাবার্তায় রাতের ভোটের বিষয়ের স্বীকৃতি মিলতে শুরু করেছে। সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘অনেকে বলেন, আমরা নাকি ভোটের আগের রাতের আধারে ভোট কেটে বাক্স ভরে জিতেছি! আমরা যদি সত্যি সত্যিই ভোট কেটে বাক্স ভরেই জিতে থাকি তাহলে বিএনপি কেনো রাতের আধারে ভোটের বাক্স ভরতে পারলো না? আমরা কি তাদের বাধা দিয়েছিলাম?’ সাবেক মন্ত্রীর এ প্রশ্ন শুধু আওয়ামী লীগের রাতের আঁধারে ভোটবাক্স ভরার বিষয়টি স্বীকার করেই নেয়া নয়, পরোক্ষভাবে রাতের আধারে ভোট কাটাকে বৈধতা দেয়ারও সামিল। তিনি বলছেন, আমরা করছি তোমরা কেন করোনি!
আওয়ামী লীগের আরেক নেতা নূহ উল আলম লেনিন বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতার জন্য নির্বাচনে কোন অনিয়ম বা ভোট কাটাকাটি হলে তার দায় আওয়ামী লীগ নেবে না। লেনিনের এ কথার প্রেক্ষিতে সমালোচকরা বলছেন, দায় নেবেন না কিন্তু সুবিধার তো পুরোটাই আপনারা নিচ্ছেন?
কমিশনারদের বয়ান
আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার বিষয়ে সবচে’ সরল স্বীকারোক্তিটি মিলেছে সিইসি নূরুল হুদার বক্তব্য থেকে। ঢাকায় নির্বাচন সংক্রান্ত এক প্রশিক্ষণকালে সিইসি বলেন, ইভিএম-এ ভোট হলে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার সুযোগ থাকবে না। তিনি মনে করেন, কেন্দ্রে আগের রাতে ব্যালট পেপার থাকার কারণেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে তা বাক্সে ভরে রাখা হয়েছে। 
উপজেলা নির্বাচনের আগে আরেক কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আগে ভোট দিতে না পারলেও জনগণ এবার সত্যিকারের ভোট দিতে পারবে। প্রায় একই সময়ে অপর কমিশনার শাহাদত হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আগের মতো মধ্যরাতে ভোট কাটলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
তবে কমিশনারদের এই হম্বিতম্বিতেও কোন কাজ হয়নি, উপজেলা নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা এসব কথা বলেছেন কিন্তু সে নির্বাচন কি গ্রহণযোগ্য হয়েছে? ভোটারদের মধ্যে কি এ নির্বাচন কোন ছাপ ফেলতে পেরেছে? ভোটারদের কি ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তোলা গেছে? মোটেই না। নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়া অনেকটাই নির্ভর করে কমিশনের দক্ষতার ওপর। তাদের কথা বা আচরণ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর প্রভাব ফেলে, ভোটারদের মনেও প্রভাব ফেলে। সিইসি নূরুল হুদাসহ অন্য কমিশনাররা নির্বাচন নিয়ে যেসব তালগোলে মন্তব্য করছেন তাতে মানুষের মনে এ প্রশ্ন জাগা অসম্ভব নয়- ’এই ইসি লইয়া আমরা কী করিবো?’ 
সম্ভবত: সিইসির ধারণা, যদি ব্যালটপেপার না থাকে তাহলে তো আর কেউ সিল মারতে পারবে না। সিইসি কি নির্বাচনের পরে দেশের পত্র-পত্রিকাগুলোর দিকে চোখ বোলাননি? বেশিরভাগ স্থানেই ভোটারদের তো কেন্দ্রেই যেতে দেয়া হয়নি, যদি মানুষ কেন্দ্রেই যেতে না পারে তাহলে তারা ভোট দেবেন কি করে? সে ক্ষেত্রে ব্যালট পেপার থাকলেও যা ইভিএম থাকলেও তা। তাছাড়া ইভিএম-এর মাধ্যমে যে আরো সহজে ভোট ডাকাতি করা যায় তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের সমস্যা ভোট দেয়ার পদ্ধতি অর্থাৎ ব্যালটে সিল মেরে ভোট দেয়া বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-এ চাপ দিয়ে ভোট দেয়া নিয়ে নয়, আমাদের দেশে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অবাধ এবং ভোটারদের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় বাধা ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা হারানোর শংকা আর এ কারণে ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়া এবং ভয়ের রাজত্ব তৈরি করা। এসব কারণেই নির্বাচনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের হয়তো ‘রাতের ভোট’ ছাড়া আর কোনো বিকল্পও নেই।
উত্তর কোরিয়ার নির্বাচনের সাথে তুলনা!
একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমও বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের অনলাইন সংষ্করণে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে বিপুল ব্যবধানে একটি রাজনৈতিক দল জয়লাভ করেছে। বিজয়ী ও বিজিত দলের মধ্যে পার্থক্যসূচক এমন চিত্র উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে আশা করা যায়, বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নয়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রমে একদলীয় গণতন্ত্রের দেশে পরিণত হতে চলেছে। টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, নির্বাচন উপলক্ষে ভোটারদের ওপর দমনপীড়ন চলেছে। ভোটে বাধা দেয়া এবং সে ব্যাপারে সামাজিক গণমাধ্যমে সমালোচনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল টাইম-এর প্রতিবেদনে।
সিএনএন এর নিবন্ধে সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি নতুন ও বিপজ্জনক যুগে প্রবেশ করেছে। এতে আরো বলা হয়, আওয়ামী লীগের অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ উপায়ে ক্ষমতা লাভের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রায় একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যত এখন অস্পষ্ট। দেশটির তরুণ ও যুবসমাজ গণতন্ত্রের ওপর বিশ্বাস হারাতে বসেছে।
ব্রিটিশ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, এই নির্বাচনে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সবচে’ বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। জাতীয় নির্বাচনের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে- আওয়ামী লীগের এই বিশাল বিজয় কি স্বস্তি আনবে নাকি দমননিপীড়ন আরও বাড়বে?
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর এসব মন্তব্য এবং সর্বশেষ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল বিশ্লেষণপূর্বক রাজনৈতিক বিশেলষকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্র বিপন্ন। যদিও উত্তর কোরিয়া আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এক নয়, তবু কারো কারো বাংলাদেশকে উত্তর কোরিয়ার মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়ার সুপ্ত ইচ্ছা থাকতেই পারে। যদি তা-ই হয়, সেটি হবে আমাদের জন্য মহা বিপর্যকর। বিশেষ করে নির্বাচনী ব্যবস্থা যেভাবে ভেঙে পড়েছে, প্রথমেই চেষ্টা করা উচিত, আর অবনতির দিকে যেতে না দিয়ে সেটিকে পুুর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা। তারজন্য নির্বাচন কমিশনকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হলে সেটিই সবার আগে করতে হবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)