বৃহস্পতিবার, ০১-অক্টোবর ২০২০, ০৬:২৩ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • ভোক্তাদের নাভিশ্বাস : লাগামহীন হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের দাম

ভোক্তাদের নাভিশ্বাস : লাগামহীন হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের দাম

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১১:৫৯ অপরাহ্ন

শীর্ষ নিউজ, ঢাকা : এ মুহূর্তে অসহনীয় উত্তাপ বইছে চাল, ডাল, আটা, মাংস, শাকসবজি, তেল, পেঁয়াজ, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে। এক মাসের ব্যবধানে সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। এর মধ্যে পেঁয়াজসহ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় শতভাগ। আর ৫০ টাকার (প্রতি কেজি) নিচে তো পাওয়াই যায় না কোনো শাকসবজি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ।
করোনার মধ্যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন কমেছে, সেই সময় হঠাৎ লাগামহীন হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের দাম। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠেছে ভোক্তাসাধারণের।

অস্বাভাবিক এই দাম বৃদ্ধির পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বারবার সেই পুরনো সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে ওই সিন্ডিকেট সদস্যদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ফলে নানা ইস্যুতে বছরে কয়েকবার নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে তারা। আর সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অল্প সময়ে হাতিয়ে নেয় কয়েক হাজার কোটি টাকা।

সূত্র বলছে, পেঁয়াজের মূল্যে কারসাজির কারণে গত বছর অন্তত ১৫টি সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করেছিল সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এর মধ্যে এমন তথ্যও পাওয়া গিয়েছিল, একটি পক্ষ বেশি দামে বাংলাদেশে বসে পণ্য আমদানি করছে। আর যেসব দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে, ওই সিন্ডিকেটই ওই দেশে বসে পণ্য রফতানি করছে বাংলাদেশে। অর্থাৎ যিনি আমদানিকারক, তিনিই রফতানিকারক। তবে এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে এবারও তারা দাম বাড়িয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।

তবে এই দাম বাড়ানোর পেছনে সেই আগের অজুহাত দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, তিন কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে- ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে পণ্যের উৎপাদন কমেছে। ইন্দো প্রদেশে পেঁয়াজের মোকামে শ্রমিকদের ধর্মঘট এবং মাওয়া ঘাটে ফেরি পারাপার বন্ধের কারণে পণ্য ঢাকায় আসতে পারছে না। ফলে বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব। তিনি বলেন, বন্যায় অনেক জায়গার শাকসবজি নষ্ট হয়েছে। কোথাও কোথাও ধানও নষ্ট হয়েছে। এ কারণে পণ্যের সরবরাহ কিছুটা কম। বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর আমাদের কারও হাত নেই। তবে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

টিসিবিসহ সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। এ ছাড়াও শীত মৌসুম আসছে। এ সময়ে নতুন ফসল ও সবজি আসবে। এতে দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। পেঁয়াজের দামের ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রতিবছর অক্টোবরের পর থেকে আমাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ শেষ হওয়া শুরু করে। এরপর আমরা আমদানি করি। তবে গত বছর ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর আমরা তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছি। এতে দাম আর ওইভাবে বাড়বে না।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান বাজার ব্যবস্থা ক্রেতাদের জন্য নয়, বিক্রেতাদের জন্য।

অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে এমন হচ্ছে। যারা অসাধু ব্যবসায়ী, তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সৎসাহস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই। আবার কর্তৃপক্ষ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সুবিধাভোগী।

যে কারণে এটি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়েছে। আর সাধারণ মানুষ এই দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি। তিনি বলেন, মূল বিষয় হল- সুশাসনের ঘাটতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। এখানে কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। সুশাসন নিশ্চিত না হলে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

 সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যানুসারে করোনার কারণে নতুন করে বাংলাদেশে এক কোটি লোক দরিদ্র হয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার কারণে অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। আর এসব সংস্থা যখন এ ধরনের দুরবস্থার সংবাদ দিচ্ছে, সেই সংকটের মধ্যেই নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দামের কারণে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার ও মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতি কেজি মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫০ টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৪২-৪৪ টাকা। প্রতি কেজি মসুর ডাল (বড়দানা) বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৭৮ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ৬৮-৭০ টাকা। খোলা আটা প্রতি কেজি ৩০-৩২ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ২৫-২৬ টাকা।

ভোজ্য তেলের মধ্যে খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ৮৬-৮৭ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৭৯-৮২ টাকা। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৫১০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫০০ টাকা।

নয়াবাজারের মুদি বিক্রেতা মো. তুহিন বলেন, মিলারদের কারসাজিতে এখন পর্যন্ত চালের দর বাড়তি। তারা সিন্ডিকেট করে মিল পর্যায় থেকে সব ধরনের চালের দর বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে চালের দর বাড়তি। তিনি বলেন, তেল কোম্পানিগুলো নতুন করে রেট দিয়েছে। যে কারণে বেশি দরে এনে বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। কারওয়ান বাজারে কথা হয় বেসরকারি বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা আশিকুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, করোনার কারণে পুষ্টিকর খাবার খেয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সরকারিভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাজারের যে অবস্থা, তাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো তো দূরের কথা, খেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম  বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এটি স্বাভাবিক নয়। তার মতে, জিনিসপত্রের দাম বাড়লে একজন আরেকজনের দোষ দেয়। তবে বিষয়টি নজরদারির দায়িত্ব সরকারের। তিনি আরও বলেন, কোনো রকম কারসাজি হলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা বলেন, ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে সারা দেশে নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা বাজারে অধিদফতরের তদারকি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশে চাল, আলু, পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ রয়েছে। তাই নিত্যপণ্য নিয়ে কারসাজি করলে অধিদফতর জিরো টলারেন্স (শূন্যসহিষ্ণুতা) দেখাবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরি বলেন, যে কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে গেলে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। তাই ভোক্তার সুরক্ষা দিতে হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দরকার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে দেয়া। কিন্তু দেশে সেটি হচ্ছে না। কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হাতেই নিত্যপণ্য নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। এরা কারসাজি করলে তখন সরকারের আর করার কিছু থাকে না।
শীর্ষ নিউজ/এন