সোমবার, ২১-অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৩৯ অপরাহ্ন
  • জেলা সংবাদ
  • »
  • ঘর পোড়লে তবু ভিটা থাহে, নদীতে ভাঙলে কিচ্ছু থাহে না

ঘর পোড়লে তবু ভিটা থাহে, নদীতে ভাঙলে কিচ্ছু থাহে না

shershanews24.com

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৭:১৬ অপরাহ্ন

রিয়াজ, পটুয়াখালী: নদীর চিরচেনা বৈশিষ্ট নিয়ে প্রমত্তা তেঁতুলিয়ার রূপ। ৫-৬ মাসে তেঁতুলিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে বিলিন হয়েছে নদীপারের ভূমি। ৭০ দশক থেকে তেতুঁলিয়ার অবাধ ভাঙ্গনে ভুমিহীন হয়েছেন অনেকে। পূর্ব-পুরুষের পেশা পাল্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছেন বিভিন্ন এলাকায়। কেউ বা করছেন মানবেতর জীবনযাপন।

নদীর তীরবর্তী বাউফলের ধুলিয়া গ্রামের হান্নান হাওলাদারের স্ত্রী মুকুল বেগম বলেন “বাপের বাড়ি খাইছে, এবার ধরছে স্বামীর বাড়ি, নদীডায় আমাগো পথের ভিখারি না বানাইয়া ছাড়বে না”।

প্রতিদিনই তেঁতুলিয়া গ্রাস করছে ভিটাবাড়িসহ কৃষিজমি। তেঁতুলিয়া নদীর অব্যহত ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে ধুলিয়া ইউপির মুলভূখন্ড। গত ৫-৬ মাসে তেঁতুলিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে বিলিন হয়েছে  ধুলিয়া গ্রামের আনছার আলী খা, বারু মিয়া, হালিম মিয়া, নুরু হাওলাদার, খালেক খা, মতি খলিফা, আব্দুল আলী মেম্বর, হুমায়ুন দেওয়ান, সুফিয়া বেগম, সবুজ হাওলাদার, রাজা মিয়াবাড়িসহ অর্ধশতাধিক বাড়ি, কয়েকশ’ পবিারের কয়েক হাজার একর কৃষিজমি। 
ভাঙনের কবলে ভূমিহীন হয়ে ২৩ নং ধুলিয়া এনকে সরকারি প্রাইমারি স্কুল মাঠে আশ্রয় নিয়েছে গনি হাওলাদার, মিন্টু দেওয়ান ও হারুন দেওয়ানের পরিবার। রাস্তার পাশে আশ্রয় হয়েছে মোশারফ গাজী, সিরাজ মিয়া, আলতাফ হাওলাদারসহ অনেকগুলো পরিবারের লোকজনের। ভিটা-বাড়ি আর সহায়-সম্বল হারিয়ে পাশের এলাকায় নানা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন সবুজ হাওলাদার। 

সবুজ হালাদারের মতো আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয় কিংবা রাস্তার পাশেও বসতঘর নির্মাণের সামর্থ হারিয়ে অন্যের ঘরে ঝিয়ের কাজ করে দিন পার করছেন মমতাজ বেগম, কালাম হাওলাদার, সুফিয়া বেগমের মতো কয়েকজন। অনেকেই করছেন মানবেতর জীবন-যাপন। কেউ কেউ আবার সাধ্য অনুযায়ী ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছেন অন্য এলাকায়।  
 
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ভূক্তভোগি গনি হাওলাদার বাড়ির রশিদ হাওলাদারের স্ত্রী জাহানারা বেগমকে (৩৮) ভাঙনের কবল থেকে বসতঘর সরিয়ে নেওয়ার পরে অবশিষ্ট রান্না ঘরের মালামাল সরিয়ে সাময়িক আশ্রয় নেওয়া বাড়ির শেষ সীমানায় স্তুপ করতে। তিনি বলেন, ‘ঘর পোড়লে তবু বাড়ি-ভিটা থাহে, নদীতে ভাঙলে কিচ্ছু থাহে না।’

নদীপাড় থেকে সরিয়ে নেওয়া মসজিদের বারান্দার পাশে পরিত্যাক্ত এক টিউবয়েলের প্লাটফর্মে নদীমুখি বিষন্ন বসে থাকা স্থানীয় বালু ব্যাবসায়ী ইয়াকুব হাওলাদারের ছেলে হান্নান হাওলাদার জলবায়ু পরিবর্তণের ইঙ্গিত করে জানান, তেঁতুলিয়ার ভাঙনে এখন আর সময় অসময় লাগে না। বর্ষায় ভাঙে, ভাঙে শীতেও। নদীর ভাঙনে ভিটা-বাড়ি, হাট-বাজার, স্কুল, মসজিদ, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ হারিয়ে যাচ্ছে ফসলী জমি। 

উপায়হীন হয়ে এনকে সরকারি প্রাইমারি স্কুল মাঠে স্বামী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে ছাপরার ঘরে আশ্রয় নেওয়া আয়শা বেগম বলেন, ‘এক সময় চাষের জমি, পুকুর, গোয়ালঘর সব কিছু ছিল। নদীর ভাঙনে সব হারাইয়া এখন আমরা পথের ভিখারি’। স্বামী এই ওয়ার্ডের মেম্বর। লজ্জা-শরমেও সব কথা কওন যায় না।’ 

তিনি জানান, ধুলিয়া উইনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিলিন হতে আর বাকি নেই। এভাবে ভাঙতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই নদী গর্ভে হারিয়ে যাবে ভাষা সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সংসদ সদস্য (১৯৬৫-৭০) ন্যাপের সাধারন সদস্য বরেন্য রাজনৈতিক নেতা সৈয়দ আশরাফের কবরস্থানসহ আশ্রয় নেওয়া এই ২৩ নং ধুলিয়া এনকে সরকারি প্রাইমারি স্কুলটিও।

শেষ বারের মতো রান্না সেরে মাটির চুলা ভাঙতে ভাঙতে মমতাজ বেগম নামে একজন বলেন, ‘গাঙে আগেও ভাঙতে দেখছি, বাইস্যায় (বর্ষায়) একটু বেশি ভাঙে। তবে এরহম ভাঙতে আর দেহি নাই।’ 

আরো অনেকে জানান, তেঁতুলিয়ার ভাঙন কবলিত এলাকার লোকজনের মধ্যে সবসময় আতঙ্ক বিরাজ করছে। দূর্দশার সীমা নেই অনেকেরই। জিও ব্যাগ (বালুর বস্তা) ফেলেও তেঁতুলিয়ার অব্যহত ভাঙন রোধ হচ্ছে না। 

গত ১৮ মে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব:) জাহিদ ফারুক শামিমের পরিদর্শনের পর ধুলিয়ার খাল থেকে বাজার এলাকায় তিন হাজার ব্যাগ (জিও ব্যাগ) বালুর বস্তা ফেলা হলেও ¯্রােতের মুখে তা অধিক সময় টেকেনি। 
ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনমান উন্নয়নে মন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে পরিবেশ ও মানব বিপর্যয় ঠেকাতে ভাঙন রোধে টেকসই প্রকল্প গ্রহনের দাবি জানান স্থানীয় এসব লোকজন। 

এদিকে ধানদী গ্রামের মজিরন, ভানু বিবি, মজিরন ও আমেনা বেগম নদী ভাঙনে সব হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। একই গ্রামের ফিরোজ খান জানান, তিনবার বাড়ি গেছে তেঁতুলিয়ার পেটে। নিমদী গ্রামের আমির হোসেন জানান, ফসলী জমি ছিল, মৌসুম এলেই ধানে ভরে যেত গোলা। গোয়ালে গরু-মহিষের কমতি ছিল না। দু’দফা বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পাশের কেশবপুর ইউপির ভরিপাশা গ্রামে নানাবাড়িতে। 

ধানদী গ্রামের সালেহা বেগম বলেন, ‘জমিজমা ভেঙে যাওয়া পরিবারগুলো খাজনা পরিশোধ না করায় নদীর অপর পাড়ে চর জাগলেও তাতে ক্ষতিগ্রস্থদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। জেগে ওঠা চরে ভূমিহীন লোকদের বন্দোবস্ত পাওয়ার কথা থাকলেও প্রকৃত ভূমিহীনরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অপর দিকে প্রভাবশালীরা কর্তৃপক্ষের হাতে মোটা টাকা ধরিয়ে ভূমিহীন কার্ডহোল্ডার হয়েছেন। জোর করে কেউ কেউ নিজ দখলে রেখেছে জেগে ওঠা চরের জমি।’    


তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে বিচ্ছিন্ন চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন ও নাজিরপুর ইউনিয়নের নিমদী, ধানদী, ডালিমা, কচুয়া ও তাঁতেরকাঠী এলাকা রক্ষায় টেকসই প্রকল্প গ্রহনের দাবিতে নদীপাড়ে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচী পালন করেছেন স্থানীয়রা। 

ইতিমধ্যে নিমদী সরকারি প্রাইমারি স্কুল রক্ষায় মাত্র ২০০ মিটারে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও অরক্ষিত পড়ে আছে ভাঙন কবলিত বিশাল এলাকা। স্থানীয় মাহবুবুর রহমান চৌধুরির অভিযোগ স্কুল রক্ষায় জিওব্যাগ ফেলা হলেও একই এলাকায় লঞ্চঘাট থাকায় পন্টুনের বাহিরে অনেক সময় ডবল ডেকার লঞ্চ ঘাট দেওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ওই জিও ব্যাগের বাঁধ। 


‘সেভ দি বার্ড এ্যান্ড বি’ নামে প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক স্থানীয় সংগঠনের পরিচালনা পরিষদের একজন এম.এ বাসার বলেন, ‘বৈশ্বয়িক আবহাওয়ার পরিবর্তন, প্রভাবশালীদের স্লুইজগেট দখল এবং ঘনফাসের অবৈধ বাঁধা জালের কারণে নদীর ¯্রােতের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ভাঙছে ধুলিয়া, মঠবাড়িয়া, নিমদী, ধানদী, বড়ডালিমা, চরব্যারেট, চর রায়সাহেব ও চরওয়াডেলের মতো অসংখ এলাকা। বিরুপ আবহাওয়া আর মানবসৃষ্ঠ এসব কারণে নদীর দু’কুল যেমন ভাঙছে তেমনি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তেঁতুলিয়ার মৎস্য সম্পদও। এভাবে চলতে থাকলে বাউফলের মানচিত্র থেকে অচিরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে নদী পাড়ের বিশাল এলাকা।’ নদী ভাঙ্গন রোধে টেকসই প্রকল্প গ্রহনেরও দাবি জানান এই পরিবেশবিদ। 
শীর্ষনিউজ/এস