শুক্রবার, ০২-অক্টোবর ২০২০, ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন

সরকারি কর্মকাণ্ডে সাফল্যের জন্য দক্ষ সৎ ও যোগ্য প্রশাসন অপরিহার্য 

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারী, ২০২০ ০৬:৫৭ অপরাহ্ন


একরামুল হক: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বছরের এই শেষ সময়ে ও নতুন বছরের শুরুতে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অনেকগুলো পদ শূন্য হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে এই সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রত্যাশী কর্মকর্তার তালিকা ছিল দীর্ঘ। কিন্তু শুধুমাত্র মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব ছাড়া অন্য কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়নি। এটি একটি ইতিবাচক দিক। সাধারণত যে দৃষ্টিকোণ থেকে এক সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রচলন চালু করা হয়েছিল সেটি কখনোই পালন করা হয়নি। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রসঙ্গে সরকারের বিধিবিধান হলো- (ক) প্রস্তাবিত পুনঃনিয়োগের পদটি কেবল কারিগরি ধরণের হতে হবে; (খ) পুনঃনিয়োগ প্রস্তাবিত কর্মচারীর চাকরি অত্যাবশ্যক হতে হবে; (গ) শূন্যপদে নিযুক্ত করার মতো কোনো কর্মচারী পাওয়া যাচ্ছে না- এরূপ পরিস্থিতি হতে হবে; এবং (ঘ) পুনঃনিয়োগ কনিষ্ঠদের পদোন্নতিতে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।
কিন্তু অতীতে বিভিন্ন সময়ে যেসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে তারমধ্যে খুব কম ক্ষেত্রেই এই নীতিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার এ বিষয়গুলো বরাবরই উপেক্ষা করা হয়েছে। বস্তুত, নীতিমালাটি পুরোপুরি অনুসরণ করা হলে জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক দেয়া আদৌ সম্ভবও নয়। কারণ, জনপ্রশাসনের পদগুলো মোটেই কারিগরি নয়, এমনকি এসব পদ পূরণের জন্য কর্মকর্তারও অভাব নেই। তাছাড়া জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বরাবরই কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্থ হন। কিন্তু বিগত সময়ে প্রশাসনে শত শত কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি নিয়োগেই একমাত্র ক্রাইটেরিয়া ছিল ‘তদবির’। যার তদবিরের জোর বেশি তিনিই নিয়োগ বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু দেখা গেছে, যাদেরকে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয় তাদের কর্মের মান আগের চেয়েও অবনতি ঘটে। ভালো সেবা তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। বরং তারা সরকারি কাজের চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খুশি রেখে নিজের আখের গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টায় মত্ত থাকেন তারা। অবশ্য, শুধু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগেই নয়, সাধারণ পদোন্নতি পদায়নেও যথাযথ যোগ্যতা, দক্ষতা বিচার-বিবেচনা করা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলবাজ আর তৈলবাজ কর্মকর্তারা আকর্ষণীয় পদগুলো বাগিয়ে নিচ্ছেন। এতে দক্ষ, যোগ্য কর্মকর্তারা ভালো কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তারা সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন না। যে কারণে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশই নিজস্ব গতিতে চলতে পারছে না। 
বিগত বছরগুলোর সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থা আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এরজন্য যথাযথ ও ভালো গুণসম্পন্ন যোগ্য কর্মকর্তার পদায়নের ঘাটতিকে দায়ী করে থাকেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, গুণসম্পন্ন যোগ্য কর্মকর্তা যারা আছেন তাদের কেউ পছন্দ করেন না। যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের পদায়নও হয় না। তাদের তদবির নেই; নিজেরা পদ, পদোন্নতির জন্য লেজুড়বৃত্তি করেন না এবং চেয়ারের লোভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেন- তাই কেউ তাদের পছন্দ করেন না। এদের পরিবর্তে অদক্ষ, অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতি দেয়া হয়। যেহেতু অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ কমকর্তাদের দিয়ে সব অপকর্ম-অনিয়ম করিয়ে নেয়া যায়। তাতে জাতীয় স্বার্থের বারোটা বাজলেও নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়া যায়। 
আর সবচেয়ে মারাত্মাক ব্যাপার হলো, ভালো গুণসম্পন্ন যোগ্য কর্মকর্তারা কখনো সঠিক পদে পদায়ন হলেও খুব বেশিদিন টিকতে পারেন না বা টিকতে দেয়া হয় না। দক্ষতা, যোগ্যতা ও সততার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সংকটে পড়েছেন- এরকমের অনেক উদাহরণ আছে প্রশাসনে। 
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাত শ্বেতহস্তীতে পরিণত হতে যাচ্ছে। কারো কারো মতে, আগামীতে এই বিদ্যুৎ খাতই গোটা অর্থনীতিকে ঢোবাবে। যদিও বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্যহারে এবং এটি অতীতের বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে যথেষ্ট সহায়তা করেছে; কিন্তু অদক্ষতা, ভুল সিদ্ধান্ত ও দুর্নীতির কারণে এই উৎপাদন বৃদ্ধি জনগণের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত মূল্য বহন করতে গিয়ে এখনই মানুষ হাঁফিয়ে উঠেছে। মনে করা হচ্ছে, এরজন্য ভবিষ্যতে আরো অনেক মূল্য দিতে হবে জনগণকে। কারণ, বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক সিদ্ধান্তগুলোর বিষয়ে যারা মূল ভূমিকা রাখছেন এদের কর্মকা-ে আর যা-ই হোক স্বচ্ছতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। 
বিগত বছরগুলোতে সরকারের আরেকটি প্রতিষ্ঠান- বাংলাদেশ বিমান অনেক কেলেংকারি কা- বাধিয়েছে। বাংলাদেশ বিমান যদিও স্বায়ত্বশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এর মালিক সরকার। দেশের জনগণের অর্থেই এটি পরিচালিত হচ্ছে। এর দায়-দেনা সরকারকেই পরিশোধ করতে হয়। হজের সময় হজযাত্রীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। এই অতিরিক্ত অর্থই সারা বছর বাংলাদেশ বিমানের পরিচালন কাজে ব্যবহৃত হয়। তারপরও অর্থের টানাটানি লেগেই থাকে। এর মূল কারণ দুর্নীতি-লুটপাট। ব্যাপক লুটপাটের কারণে এটিকে কেউ কেউ শ্বেতহস্তী বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন। বাংলাদেশ বিমানের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি প্রায়ই খবরের শিরোনাম হতে দেখা যায়। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিমান এর ব্যবস্থাপনায় বার বার পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু যাকেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় তিনি ‘রাবন’ বনে যান। 
বস্তুত, যারা কর্মকর্তা পদায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন তাদের অধিকাংশই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেন না। যে প্রতিষ্ঠান বা পদের জন্য যিনি উপযুক্ত তাকে পদায়ন করা হয় না। সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান সকল কর্মকর্তাকে ভালোভাবে চেনেন না, চেনার কথাও নয়। কিন্তু যারা এ বিষয়ে সুপারিশ করেন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজকে প্রভাবিত করেন তাদের একচোখা নীতির কারণে যোগ্য কমকর্তার পদায়ন হয় না। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সরকার ও জনগণ। [চলবে]