সোমবার, ২৮-সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ন

তিস্তায় বাংলাদেশের চীনা চাল, ব্যাকফুটে দিল্লি

shershanews24.com

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন

ভারত ভূষণ: ভারত-বাংলাদেশের পানি-রাজনীতিতে বেইজিং-এর জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনায় দিল্লিতে সতর্কঘণ্টা বেজেই চলছে। ১৮-১৯ আগস্ট পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ শ্রিংলার আকস্মিক ঢাকা সফরকে ওই প্রেক্ষাপটেই দেখা হচ্ছে। তিস্তায় একটি পানি ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে ৯৮৭.২৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রস্তাব দিয়েছে চীন। তিস্তা নদী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বহমান। এই বছরের ডিসেম্বরে এই ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা।

চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কো-অপারেশন বা পাওয়ার চায়না এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। কাজ শুরু হবে ২০২১ সাল থেকে। ২০০৬ সাল থেকে ব্রহ্মপুত্র বেসিনে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সহযোগ থাকলেও, এর আগে চীনা কোনো কোম্পানি অন্তত মাঠে ছিল না। যদিও সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, শ্রিংলার সফর মূলত বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ, তারপরও এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম যে তিস্তা বেসিনে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা হয়নি।

প্রকল্পের অধীনে নদীর বাংলাদেশ অংশে প্রায় ১১৩ কিলোমিটার পথে জড়িত থাকবে চীনা কোম্পানিগুলো।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও, শুষ্ক মৌসুমে পানির উপলভ্যতা, ড্রেজিং, ভূমি পুনরুদ্ধার, নৌ যোগাযোগ ও পরিবহণ, নদীস্রোতের কারণে সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি কমিয়ে আনা এবং বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা—এসবই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। বর্তমানে নদীর প্রস্থ ১ থেকে ২ কিলোমিটার। এই প্রস্থ ১ কিলোমিটারে কমিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে অন্তত ১০ মিটার গভীরতা বজায় রাখা হবে। নদীর দৈর্ঘ্যজুড়ে বেশ কিছু শিল্পাঞ্চল, আধুনিক ও নগরে কমপ্লেক্স, স্মার্ট সিটি, ইত্যাদিও চিন্তা করা হয়েছে।

উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলাদেশে সেচের জন্য ব্যবহার করা হয় তিস্তার পানি। রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায়, অর্থাৎ নিলফামারি, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও রংপুরে প্রায় ৬৩ শতাংশ চাষযোগ্য অঞ্চলই সেচ-নির্ভর। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে ডালিয়া বাঁধ নির্বানের আগে এই অঞ্চলে খরা দেখা দিতো ব্যাপক। আর এখন এই অঞ্চলে বছরে তিনবার ফসল ফলে।
বাংলাদেশ বলছে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত নদীর পানির স্রোত কমে যায়। আবার বর্ষাতে রীতিমত বন্যা দেখা যায়। এজন্য গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে ভারতের এককভাবে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করাকেই দুষছে বাংলাদেশ। মৌসুম-ওয়ারি পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে আনতে একটি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে দরকষাকষি চলছে।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তার ঢাকা সফরে তিস্তা পানিবন্টন চুক্তি সই করতে প্রস্তুত ছিলেন। চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানির সমবণ্টনের ফর্মুলা ছিল। গজলডোবা বাধে ভারত ৭৫ শতাংশ পানি নিয়ন্ত্রণ করবে, আর বাংলাদেশকে দেবে ২৫ শতাংশ। যেহেতু পানি ক্রমান্বয়ে ভাটির দিকে নামতে থাকবে, এই ২৫ শতাংশই বাংলাদেশে আসতে আসতে ৫০ শতাংশে পরিণত হবে। একেই সমবণ্টন বলা হচ্ছিল।

তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই চুক্তি প্রতিহত করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এই চুক্তি হলে পশ্চিমবঙ্গে সেচ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যদিও এটি স্পষ্ট ছিল যে তার রাজ্য গজলডোবা বাঁধের ৭৫ শতাংশ পানিই ব্যবহার করে শেষ করতে পারবে না। চুক্তি নস্যাৎ করতে তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন, এই চুক্তির ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে রাজ্যের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলাপ করা হয়নি। আঞ্চলিক দেমাগ আহত হওয়ার আভাস ছিল তার কথায়।

এরপর ২০১৫ সালের জুনে মমতাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফর করলেও ওই চুক্তি অদেখাই রয়ে যায়। মোদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘নায্য সমাধানে’র প্রতিশ্রুতি দিলেও, এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনের পূর্বে এই বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তিস্তায় সম্ভবত চীনা উপস্থিতির সম্ভাবনা আগেই আঁচ করতে পারেনি ভারত। বাংলাদেশ এর আগে এই প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংক ও জাইকার সহায়তা চেয়েছিল। অর্থাৎ এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ভারতের সাহায্য আসুক আর না আসুক, তিস্তা বেসিনের ব্যবস্থাপনা ভালো করা দরকার হয়ে পড়ে বাংলাদেশের। যদিও অন্যান্য সব পথ ব্যার্থ হওয়ার পরই ঢাকা চীনের দ্বারস্থ হয়েছে, তবুও সময়টা ভারতের জন্য খারাপ হয়েছে।

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে মোদি সরকারের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে ইতিমধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ক্ষমতাসীন অনেকেই বাংলাদেশি অভিবাসীদের বর্ণনা করতে অনুপ্রবেশকারী বা উইপোকার মতো আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেছেন। সাম্প্রতিককালে, কভিড-১৯ মহামারি চলার সময় তবলীগ জামাতের অনুসারীদের যেভাবে হেনস্থা করা হয়, তা-ও বাংলাদেশে অনেকের মনে ছাপ ফেলেছে।

তবে চীনের এই সম্পৃক্ততা কিন্তু তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরে ভারতের বৃহত্তর ব্যার্থতার প্রেক্ষাপটেই হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আরও ৫৩টি বড় বড় আন্তঃসীমান্ত অভিন্ন নদী রয়েছে। তিস্তা চুক্তির হওয়ার কথা ছিল এই নদীগুলোর পানি বণ্টনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা।
এখন বাংলাদেশে তিস্তা বেসিনে চীনের সংশ্লিষ্টতায় বেশ কয়েক ধরণের প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশই কিন্তু অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে চীনের কাছ থেকে এই ঋণ চেয়েছে। তাই, চীন এই ধরণের ঋণকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশকে ঋণের জালে ফেলতে চায়—এই যুক্তি এখানে খাটবে না। তারপরও চীনের ভূরাজনৈতিক কৌশলে বাংলাদেশ আরও জড়িয়ে পড়বে, এমন সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই চীনের বেল্ট ও রেড উদ্যোগের সদস্য।

অপরদিকে তিস্তার দরকষাকষির দ্বিপক্ষীয় হলেও ভারত এখানে তৃতীয় পক্ষের ছায়া দেখবে, যেটি কিনা বাংলাদেশের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া হাইড্রোলজিক্যাল অনেক উপাত্তও পাবে, যা সাধারণত তাদের নেই। তিস্তা জুড়ে নতুন বাঁধ, সেচ সিস্টেম, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও স্মার্ট সিটি বস্তুত বাংলাদেশে চীনের প্রকৌশল ও প্রকল্প বাস্তবায়নের পারদর্শিতারই জানান দেবে।
এই প্রথম চীন গভীরভাবে ভাটি অঞ্চলের পানি-ব্যবস্থাপনা রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। তবে উজানের দেশ হিসেবে বিভিন্ন এশিয়ান নদীর ক্ষেত্রে (তিব্বত মালভূমি থেকে উৎসরিত) চীন আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মানেনি।

নদীগুলোকে শাসনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অধিকার বজায় রেখেছে। ভাটি অঞ্চলের কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সাথে আন্তঃসরকারি মেকং রিভার কমিশনে যোগ দিতে চীন অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। ব্রহ্মপুত্র নিয়েও ভারতের সঙ্গে কোনো সহযোগিতা করে না চীন। উজানে বাঁধ নির্মানের বিষয়টি অন্ধকারে রেখেছে। এছাড়া উজানের পানি প্রবাহের উপাত্তের জন্য ভারতকে অর্থ পরিশোধেও বাধ্য করেছে।

এছাড়া নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত এই কারণে যে, উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলাদেশে চীনা উপস্থিতি সীমান্তের অপরপাশে অবস্থিত ভারতীয় নিরাপত্তা স্থাপনায় নজর রাখতে বেইজিং-কে অধিক সুবিধা দেবে। বিশেষ করে কৌশলগত চিকেন’স নেক অঞ্চল অর্থাৎ সিলিগুড়ি কোরিডোর হতে পারে এই নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি।

ভারত যদি এখন তিস্তা নদীর পানির নায্য ও উভয়পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য বণ্টনের বিষয়ে দ্রুত সমঝোতায় না পৌঁছায়, তাহলে নিজের পানি সমস্যা নিয়ে বিকল্প সমাধান খোঁজার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না। ভারত হয়তো চীনের মতো আকর্ষনীয় ঋণ দেওয়ার অবস্থায় নেই। তবে ভারত ঢাকাকে এমন কিছু দিতে পারে, যা চীন পারবে না—সেটা হলো শুষ্ক মৌসুমে অতিরিক্ত পানি। এছাড়া ভারত বাংলাদেশকে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনারও প্রস্তাব দিতে পারে। ভাটির দেশের প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে পারস্পরিকভাবে লাভজনক চুক্তিতে পৌঁছতে ভারতের যে উপায়হীন, তা কিন্তু নয়।

(ভারত ভূষণ ভারতের একজন সিনিয়র সাংবাদিক। তার এই নিবন্ধ ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।)